RAW এর কয়েকটি গোপন মিশন

👉পর্ব ৪

✍️দেবশ্রী চক্রবর্তী।

Reasearch and Analysis Wing অর্থাৎ RAW এর সম্পর্কে আপনারা অনেক কিছু জানেন। আপনারা জানেন যে এটি একটি ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা এবং এই সংস্থাটি ভারতের অভ্যন্তরীণ এবং বহির্দেশীয় সুরক্ষার জন্য গুপ্তচরের কাজ করে। এই সংস্থাটির গঠন ১৯৬২ সালের ভারত চীন যুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর হয়েছিল। “র” তার সব রিপোর্ট সোজাসুজি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠায়। ভারতের ইতিহাসে এই গুপ্তচর সংস্থাটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। সিকিমের মানুষের মধ্যে “র” এর গুপ্তচরেরা এমন গভীর দেশপ্রেমের সঞ্চার করে দিয়েছিলেন যে সিকিম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এখানেই শেষ না, ভারতের পরমাণু পরীক্ষণের ব্যাপারেও এদের বিশাল অবদান।
আজ আমি এই পর্বে ভারতীয় এই গুপ্তচর সংস্থাটির বেশ কিছু গোপন অপারেশন নিয়ে আলোচনা করবো।

আজ প্রথম যে অপারেশন নিয়ে আলোচনা শুরু করব তা হচ্ছে “স্নেচ অপরেশান“। এই অপরেশনটি সম্পর্কে কারুর কোন ধারনাই ছিল না। ” দ্যা উইক” নামের একটি পত্রিকায় এই অপারেশন নিয়ে প্রথম একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এই অপারেশন চালানোর জন্য ভারতের প্রধান দুই গোয়েন্দা সংস্থা আই বি এবং এক সাথে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটানে কাজ শুরু করে। তারা এই সব দেশে ৪০০ এর বেশি জায়গায় তল্লাশি করে কয়েক হাজার আতঙ্কবাদীকে গ্রেফতার করেছিল
এর পরের অপরেশন্টির নাম ” স্মাইলিং বুদ্ধ” এটি ভারতের প্রথম পরমাণু কার্যক্রমের নাম। ১৮ ই মে ১৯৭৫ সালে ১৫ কিলোটন প্লুটোনিয়াম ডিভাইসের পরীক্ষা করা হয়েছিল ভারতের পোখরানে। এরপর থেকেই ভারত পরমাণু ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে নিজের জায়গা করে নেয়।
এর পরের অপরেরশনটির নাম হচ্ছে “অপারেশন চাণক্য“।ভারতে অনুপ্রবেশকারীদের আটকানোর জন্য “র” এই মিশনটি শুরু করেছিল। এই মিশনটি চাণক্যের নীতি “দান দাও আর বিজয় পাও” এই নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই মিশনে “র” তার ভারতীয় এক চরকে আই এস আই এস এ পাঠিয়েছিল। সেই চর এই সংস্থাটির বেশ কিছু সদস্যকে ভারতের সমর্থকে পরিণত করে।
এর পরের অপরেশনটি হচ্ছে “মালদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠা”পিপলস লিবারেশন অফ তামিল ইলম নামে এক তামিল আতঙ্কবাদী সংস্থা মালদ্বীপে আক্রমণ চালায়। মালদ্বীপ ভারতের সাহায্য চাইলে “র” ভারতের সেনাকে আতঙ্কবাদীদের সম্পর্কে সব তথ্য দিয়ে মালদ্বীপ পাঠায়। ১৬০০ সেনা বিমানে করে মালদ্বীপের হুল্লা হুল্লা দ্বীপে গিয়ে নামে। সেনা কিছু ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।
সব শেষে আমি আলোচনা করবো “র” এর দীর্ঘ দিন ধরে চালানো সব থেকে ভয়ঙ্কর অপরেশান ” সি আই টি এক্স” সম্পর্কে।
সময়টা ছিল ১৯৮০ সাল। পাঞ্জাবের ছোট্ট একটি গ্রামের অধিবাসী সুরজিৎ সিং অন্য দিনের মতন নিজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। সুরজিৎ মাঝে মধ্যেই এরকম যেতেন এবং তিন চারদিন পর আবার ফিরে আসতেন। কিন্তু এবার আর তা হল না, সুরজিতের স্ত্রী অপেক্ষা করতেই থাকলেন তার স্বামীর। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষ হল তিরিশ বছর পর। যেদিন বৃদ্ধ সুরজিৎ বাড়ি ফিরলেন ওয়াঘা বর্ডার দিয়ে। আসলে সুরজিৎ এই দীর্ঘ তিরিশ বছর পাকিস্তানের এক জেলে বন্দী ছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সুরজিৎ এমন কি করেছিলেন যে তাকে তার জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় জেলে কাটাতে হল? এই প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে ১৯৭১ সালে। এই সময় এই সংস্থা তার কাজ জোড় কদমে শুরু করে দিয়েছিল। তারা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের পাকিস্তানের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করে নতুন দেশ বাংলাদেশ উপহার দিয়েছিলেন। এই সময় তিরানব্বই হাজার পাকিস্তানী সেনা আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এই সময় পাকিস্তান একটা ব্যাপার পরিষ্কার বুঝে গেছিল যে ভারতের বুকে সোজাসুজি আঘাত করা তাদের পক্ষে সম্ভব না। তাই আঘাত করতে হবে পেছন থেকে। তাই পাকিস্তান ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন গুলিকে সব রকম ভাবে সাহায্য করতে থাকে। এই সব সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান হাজার হাজার ভারতীয়কে হত্যা করতে থাকেন। কিন্তু আলোচনা করেও এই সমস্যার সমাধানে আসা যাচ্ছিল না। যখন এই আক্রমণ কিছুতেই থামছিল না, তখন “র” এর চিফ এ কে বর্মাকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বলেন যেমন করেই হোক এই পাকিস্তানকে জব্দ করতেই হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত পেয়েই “র” দুটি দল তৈরি করেন, সি আই টি এক্স এবং সি আই টি জে। সি আই টি জে এর কাজ ছিল পাঞ্জাবের খালিস্থানী আন্দোলনের কোমর ভাঙ্গা। আরেকদিকে সি আই টি এক্স এর কাজ ছিল, ভারতে যদি একটি হামলা হয়, তাহলে পাকিস্তানে দুটি হামলা করানো। সুরজিৎ ছিলেন এই দলের একজন গোপন সৈনিক। “র” এর অফিসাররা পাঞ্জাবের গ্রাম থেকে জবানদের সংগ্রহ করে তাদের ট্রেনিং দিয়ে পাকিস্তান পাঠাতে লাগলেন। এই সৈন্যরা পাকিস্তান ঢুকে নিজেদের নেটওয়ার্ক তৈরি করত এবং তাদের সব রকমের সাহায্য দিয়ে নিজেদের কাজ করিয়ে নেওয়া। সুরজিৎ বিবিসি এর সাংবাদিক গীতা পান্ডেকে একটি সাক্ষাৎকারতে জানিয়েছিলেন, তার কাজ ছিল পাকিস্তানের আর্মির থেকে গোপন তথ্য সংগ্রহ করা। তিনি দু দিন বাড়ির বাইরে থেকে তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং বাড়ি ফিরে “র” এর হ্যান্ডলারদের তথ্য সরবরাহ করে দিতেন। কিন্তু এক রাতে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাকিস্তানে পৌঁছে ধরা পরে গেলেন। সুরজিৎ বলেন, তার সাথে ধোঁকা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কি এমন ধোঁকা তার সাথে হয়েছিল যে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়? যা পরবর্তী সময়ে যাবজ্জীবন করে দেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালে আই কে গুজরল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েই “র” কে তার অপারেশন বন্ধ করে দিতে বলেন। তিনি বলেন এর জন্য ভারত পাকিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। গুজরল মোরার্জি দেশাইয়ের মতনই “র” বিদ্বেষী ছিলেন। তার এই এক সিদ্ধান্তের জন্য কয়েক শত ভারতীয় চর ধরা পরে যায়। কিন্তু পাকিস্তান কিন্তু ভারতে বিস্ফোরণ চালিয়েই যেতে থাকে।
সুরজিৎ এর মতন করামত রোহি আর গোপাল দাস সেই সময় ধরা পরেকরামত পাকিস্তানে ২০ বছর জেল খাটে আর গোপাল দাস ২৭ বছর সেখানে জেলখাটে। গোপাল দাস দেশে ফিরে তার ২৭ বছরের ক্ষতিপুরন চায় সুপ্রিম কোর্টে । কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলে আপনি যে “র” এর হয়ে কাজ করতেন তার কোন প্রমান নেই। সত্যি এখানেই তো আমাদের সব থেকে দুর্ভাগ্য। একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমী যে নিজের জীবনের ২৭ বছর দেশকে দিল, তার প্রতিদানে সে কিছুই পেল না। কারন “র” তার চরেদের খাতায় কলমে কোন নিয়োগ করে না,তাদের সব কিছু মৌখিক। আইডেন্টিটি কার্ডও থাকে না এদের। যারা নিজেদের প্রান বিপদে ফেলে আমাদের রক্ষা করে , তারা প্রতিদানে শুধু হতাশা আর অবহেলা পায়। 

বিখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েলের একটি উক্তি দিয়ে আমার এই লেখা শেষ করবো, “WE SLEEP SOUNDLY IN OUR BEDS BECAUSE ROUGH MEN STAND READY IN THE NIGHT TO VISIT VIOLENCE ON THOSE WHO WOULD DO A SOUND”.

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *