ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থ র’ এর অর্ধশতবর্ষ পূর্ন পর্ব ৩

✍️দেবশ্রী চক্রবর্তী

কুলভূষন যাদবের ঘটনাটি আমাদের সবাইকে অনেক প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড়করিয়ে দিয়েছে। এই একটি ঘটনা ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থাটির এবং তার চরেদের প্রতি আমাদের আগ্রহ বারিয়ে দিয়েছে।                                🇮🇳হরিন্দর সিক্কা🇮🇳

সময়টা ছিল ১৯৯৯ সাল। কারগিল যুদ্ধের রিপোর্ট সংগ্রহ করার জন্য বহু সাংবাদিক তখন রনাঙ্গনে। এদের মধ্যে একজন শিখ সাংবাদিক হারিন্দর সিক্কা প্রশ্ন করেন যে এতো ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা র এর সব থেকে বড় হার। পাকিস্তান এত বড় আক্রমণ চালাতে যাচ্ছে তা তারা বিন্দুমাত্র জানতে পারল না? তখন একজন সেনা জবাব দিয়েছিল যে তার মা কিন্তু সব খবর ঠিক দিয়েছিল। তার মায়ের অবদান ছিল বলেই বাংলাদেশ যুদ্ধে ভারতের জয় হয়েছিল। এই কথাটা শুনে হারিন্দর সিক্কার মনে একটা খোঁচা লাগে। এই বর্ষিয়ান সাংবাদিক বুঝতে পারেন যে এর পেছনে গভীর কোন রহস্য লুকিয়ে আছে। তিনি সেই জওয়ানের কাছ থেকে তার মায়ের ঠিকানা নিয়ে পৌঁঁছে যান কাশ্মীরেরএক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে নদীর ধারে এক বিশাল পাহাড়ের নীচে ছোট্ট একটা কাঠের বাড়ি। সাংবাদিক ধীরে ধীরে দরজায় আঘাত করলে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে আসেন। সৌম্যএবং শান্ত চেহারার এই মহিলাকে দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে যে এরকম চেহারার এক মহিলা কি করে চরের কাজ করতে পারে। তবু সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, আপনি সহমত খান? ব্যাস এই প্রশ্নটাই যথেষ্ট ছিল। তিনি কোন কথা বলতে ইচ্ছুক না বলে বৃদ্ধা দরজা বন্ধ করে দেন। বর্ষিয়ান সাংবাদিকও ছাড়ার পাত্র না। তিনি যখন রহস্যের সন্ধান পেয়েছেন তখন এর শেষ দেখে ছাড়বেন। এক বোতল জল কিনে এনে তিনি বসে পরলেন বৃদ্ধার বারান্দায়।

বিকেল ঘনিয়ে যখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে তখন আবার দরজা খোলার আওয়াজ হয়। সাংবাদিক দেখেন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন তার পেছনে। বৃদ্ধা তাকে খুব শান্তভাবে ঘরে আসতে বলেন।

এখন সাংবাদিক আর বৃদ্ধা মুখোমুখি বসে আছেন। বৃদ্ধাকে সাংবাদিক প্রশ্ন করেন আপনি এটা কার বাড়িতে আছেন? বৃদ্ধা উত্তরে বলেন, তিনি তার ভৃত্য আবদুলের বাড়িতে আছেন। সাংবাদিক প্রশ্ন করেন আবদুলকোথায়, তাকে তো দেখছি না। উত্তরে তিনি বলেন আব্দুলকে আমি ট্রাক চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছিলাম। বৃদ্ধার চোখে জল। তিনি জানান একজন চরকে এমন অনেক কাজ করতে হয় যা করতে তার ভালো লাগে না। বৃদ্ধার কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন তার বাবার কথায় পাকিস্থানের এক সেনা অফিসারকে বিয়ে করে সেখানে চর হিসাবে যান। সেখান থেকে তিনি ১৯৭১ এর যুদ্ধের সময় ভারতের গুপ্তচর সস্থাকে বহু তথ্য সর্বরাহ করেছিল।

হরিন্দর সিক্কা জানতেন তিনি ভারতীয়গুপ্তচরসংস্থা র এর কাছ থেকে কোন তথ্য পাবেন না।কারন গোপনীয়তা রক্ষা করাই তাদের কর্তব্য। হরিন্দর নিজে পাকিস্তান যান এবং সহমত খান নামক এক মহিলার সম্পর্কে বহু তথ্য সংগ্রহ করেন। তিনি জানতে পারেন এই নামের এক ভারতীয় মেয়ে এখানে বিয়ে করে এসেছিল। সে আসলে তার সহজসরল চেহার মাঝে একজন ভারতীয় চর ছিলেন। হারিন্দর জানতে পারে পাকিস্থানের একের পর এক জলপথে আক্রমন তার তথ্য পাচারের জন্য ব্যার্থ হয়ে গেছিল। হরিন্দরের গায়ের লোম খারা হয়ে যায়। সে অবাক হয়ে যায় এই ভেবে যে সে যার সাথে দেখা করেছিলেন তিনি আসলে ভারতীয় গুপ্তচর সহমত খানই।

হরিন্দর আর সময় নষ্ট করেননি। তিনি দেশে ফিরে সহমতের সাথে দেখা করেন। এবং তার অনুমতিনিয়েই “calling Sehmat” নামে একটি বই লিখে ফেলেন। যা পরবর্তীসময়ে মেঘনা গুলজারের পরিচালনায় রাজি নামের একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়। আলিয়া ভাটের সহমতের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করে।

একটা প্রচলিত ধারনা আমাদের অনেকের মধ্যেই আছে যে মুসলিম মাত্রই দেশদ্রোহী। তার ওপর যদি সে কাশ্মীরি হয় তাহলে তো আর কোন কথাই নেই। আজ যে সহমতের কথা পাঠকদের সামনে তুলে ধরলাম, তিনি কিন্তু কাশ্মীরি মুসলিম ছিলেন।

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *