ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা র’ এর অর্ধশত বর্ষ পূর্ন পর্ব ২

আমাদের আশেপাশে বহু পরিচিত মুখেরা ঘোরাফেরা করে। এইসব খুব পরিচিত মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেক অপরিচিত রূপ। নিত্যদিন যার সাথে আমাদের ওঠা বসা, যে মানুষটির কাছে মন খুলে যেকোন ব্যক্তিগত কথা খুব সহজে ভাগ করে নিতে পারি, সেই মানুষটা আসলে কে, আমরা অনেক সময় তা বুঝতে পারি না। এমন একজন মানুষ হঠাৎ আমাদের জীবনে এসে হাজির হন এবং তার আন্তরিক ব্যাবহারে আমাদের খুব আপন একজন হয়ে ওঠেন। মাঝে মাঝে উপহার দেন কিংবা কোন কারন ছাড়াই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। কোন দিন ভেবে দেখেছেন তার এই আন্তরিক ব্যাবহারের পেছনে কোন চাল নেই তো। মাকড়সা যেমন খুব ধীরে ধীরে তার জাল বিস্তার করে, এই সব মানুষরাও খুব ধীরে ধীরে আপনার চারপাশে এমন এক জাল বিস্তার করে আপনাকে ঘিরে ফেলে। তখন এর বেরোবার পথ থাকে না। গুপ্তচর সংস্থাটি ঠিক এই ভাবেই তার জাল চারপাশে বিস্তার করে ফেলে। বহু ক্ষেত্রে তারা খুব সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে এসব কাজ করান। সাধারণ মানুষ থেকে বিখ্যাত শিল্পী কেউই বাদ যান না। তাদের নিয়ন্ত্রণে গোটা দেশের সেনা এবং পুলিশ। কথার খেলাফ করলে দেশদ্রোহিতার অপবাদ দিয়ে চলবে ভয়ঙ্গকর অত্যাচার, যা হয় তো আমরা সিনেমা কিংবা বইয়ের পাতায় আমরা দেখেছি।

আজকের বিখ্যাত মাফিয়া ডন হয় তো কোন এক সময়ে এই সংস্থাটির জন্য এজেন্টের কাজ করত এবং সে খুব গুরুত্বপূর্ন এজেন্ট ছিল। কিন্তু কোন একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত যখন আসে, তখন তা তার ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি আঘাত আনে। এই জন্য সে অন্য দেশের এজেন্টে পরিণত হয় আর অন্য দেশের এজেন্ট হয়ে নিজের দেশের ওপর হামলা করে বসে। পর পর বিস্ফোরণ করায়।

এ এক অদ্ভুত খেলা। কেউ কেউ আবার ডবল এজেন্টের কাজ করেন।একজন মানুষ যে দুই দেশের হয়ে চর বৃত্তি করছে। এরকম এক চরের জন্য ভারতীয় চর মোহন লাল ভাস্করকে পাকিস্তানের জেলে ভয়ঙ্কর অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। রয়ের প্রাক্তন প্রধান বিক্রম সুদ তার লেখা বইতে জানিয়েছেন, এক মুখ যখন সব জায়গায় আপনি দেখতে পাবেন, তখন আপনাকে মেনে নিতেই হবে এই লোকটি আসলে একজন চর।

আজ আমি এমন একটি বিষয় পাঠকের সামনে তুলে ধরব, যা পড়ে আপনারা অবাক হবেন। র’ এজেন্টরা কয়েদীদের দিয়েও কাজ করান। তারা লক্ষ্য করেন এসব কাজে কারা পারদর্শী। বহু ক্ষেত্রে এমন হয় একজন কয়েদী, যার ফাঁসী হয়েছে, ফাঁসীর পর তাদের ডেড বডি আমাদের দেখানো হয় না। বলা হয় এঁদের জেলের ভেতরেই কবর দেওয়া হয়েছে। সত্যিই কি তাদের মৃত্যু হয় না এঁদের লুকিয়ে অন্য কাজে লাগানো হয়।

আজ এই পর্বে ভারতের এক রাজপুতের ভয়ংকর সাহসের গল্প বলবো। যে ভারতের প্রাক্তন সংসদ ফুলন দেবী যে কিনা এক সময় দস্যু রানী নামে পরিচিত ছিল, তাকে হত্যা করেছিলেন। হ্যাঁ, বন্ধুরা ঠিক ধরেছেন আজ আমার আলোচনার বিষয় শের সিং রানা। ফুলন দেবীকে হত্যা করে তিনি এআত্মসমর্পন করেন এবং তাকে তিহার জেলে রাখা হয়। কিন্তু রানা অন্য কয়দীদের মতন ছিলেন না। সে সব সময় বলত একদিন এই জেল থেকে আমি বেরবো। কেউ আমাকে এখানে আটকে রাখতে পারবে না। হুম, রানা সেদিন ঠিক কথাই বলেছিল। সে তিহার জেল থেকে পারি দেয় এক ভয়ঙ্কর দেশে। সেখানে সে নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে আবার ফিরে আসে তিহার জেলে। আমি যে কথা গুলো লিখছি, তা হয় তো পাঠকদের বিশ্বাস করতে একটু অসুবিধা হচ্ছে, তাই বিস্তৃত ভাবে একটু বলি। সত্যই এই রাজপুত জবানের জীবন কোন সিনেমার গল্পর থেকে কম উত্তেজক না।

শের সিং রানার জন্ম ১৭ই মে ১৯৭৬ উত্তর প্রদেশের রুড়কিতে হয়েছিল। শের সিং যখন চারবছরের ছিল, তখন চম্বলে ডঙ্কা বাজত কুখ্যাত ডাকাত ফুলন দেবীর। আজও চম্বলের মানুষ ফুলন দেবীর নাম শুনে ভয়ে কেঁপে ওঠেন। এই ফুলন দেবী বেহময়ী গ্রামের ২২ জন রাজপুতকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি মেরে দিয়েছিল। যার পর সে আত্ম সমর্পন করেন এবং ১১ বছর জেল খেটে সক্রিয় রাজনীতিতে আসে।। চম্বলের ডাকাত রানী এরপর দিল্লির অশোকা রোডের সুসজ্জিত বাংলোতে থাকা শুরু করেন। ২০০১ সালে শের সিং রানা ফুলনের সাথে দেখা করতে তার বাড়ির গেটে যায় এবং তাকে গুলি মেরে হত্যা করে আত্মসমর্পন করে। এই সময় তিন বছর সে তিহার জেলে থাকে।

১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালে একদল পুলিশের বেশ ধারী লোক এসে কিছু কাগজ পত্র দেখিয়ে রানাকে জেল থেকে নিয়ে যান। তিহারের মতন এরকম এক সুরক্ষিত জেল থেকে উত্তরাখণ্ড পুলিশের তিনজন অফিসার যারা নাকি ছদ্মবেশী তারা কি করে নিয়ে যায়। তিহার জেলের কর্ম কর্তারাও এত বোকা নিশ্চয়ই নয় যে তারা এত সহজে এক খুনিকে ছেরে দেবে। এখন প্রশ্ন থেকে যায় এ তিনজন আসলে কে? আর এত লোক থাকতে তারা রানাকে কেন টার্গেট করল। এখানে একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার এটা একটা গভীর চক্রান্ত যার সাথে হয় তো প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কিছু অদৃশ্য মুখ যুক্ত আছে।

এই ঘটনার দু বছর পর ১৭ ই মে ২০০৬ তারিখে রানা আবার তিহার জেলে ফিরে আসে। এখন যে ঘটনা বলবো তা মাঝের এই দু বছরের ঘটনা। আমাদের ভারতের বুকে দেশমাতার বহু সুপুত্রের জন্ম হয়েছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন পৃথ্বীরাজ চৌহান। তাকে ভারতের শেষ হিন্দু সম্রাট বলা হয়। মহম্মদ ঘোরি তার দুই চোখ অন্ধ করে দিয়েছিল। অন্ধ পৃত্বীরাজকে সে বলেছিল তুমি তো এত বড় যোদ্ধা, আমাকে তীর দিয়ে হত্যা কর। তখন পৃত্বীরাজের সভা কবি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পৃথ্বীরাজকে বললেন, “ চার বংশ, চৌবিশ গজ, অঙ্গুল অষ্ট প্রমাণ, তা- উপর সুলতান হ্যাঁ, মত চুকে চৌহান”। এই ইংগিতই যথেষ্ট ছিল। পৃথ্বীরাজ তীর চালিয়ে ঘোরিকে হত্যা করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ির লোকেরা এসে পৃত্বীরাজকে হত্যা করে দেন।

কান্দাহার বিমান অপহরণের ঘটনা যখন ঘতে , তখন প্রাক্তন বিদেশ মন্ত্রী জসবন্ত সিং কান্দাহারে গেছিলেন। সেখানে গিয়ে খোদ তালিবান প্রশাসনের আধিকারিকদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন আফগানিস্থানের গজনীতে পৃথ্বীরাজ চৌহানের সমাধি মহম্মদ ঘোরির সমাধির বাইরে আছে। যারা মহম্মদ ঘোরির সমাধি দর্শনে আসেন, তারা মহম্মদ ঘোরিকে দর্শন করার আগে পৃত্বীরাজের সমাধির ওপর জুতো দিয়ে মেরে, প্রস্রাব করে অপমান করেন।

ভারত সরকারের ইচ্ছে ছিল পৃথ্বীরাজের দেহের অবশেষ তারা ভারতে নিয়ে আসবে। গোপনে তারা সেই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার চেষ্টা করছিলেন। রানা যখন তিহার জেলে ছিল, তখন সে খবরের কাগজে এই বিষয়ে বেশ কিছু রিপোর্ট পড়েছিল। কিছুদিন আগে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে সে জানিয়েছে যে রিপোর্টটা পড়ে তার ইচ্ছা হয়েছিল সে পৃথ্বীরাজের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনবে। রাঙাকে যেখানে রাখা হত, সেখানে থাকত তিহারের কুখ্যাত অপরাধীরা। তাদের মধ্যে তালিবেনীও ছিল কয়েকজন। তাদের মুখেও নাকি রানা এই ঘটনার সত্যতা জানতে পেরেছিল। একদিন আদালতে যাবার পথে সে তার ইচ্ছে তিহার জেলের পুলিশ কর্তাদেরও সে জানায়।

তিহার জেল থেকে রানা প্রথমে পৌছয় রাঁচি। সেখান থেকে তার নকল পাসপোর্ট আর ভিসা তৈরি হয়। সেই পাসপোর্ট নিয়ে তাকে কলকাতা থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশ। সেখানে গিয়ে রানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু করে। এখানে বেশ কিছু প্রশ্ন কাজ করে আর তা হল একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে এত কিছু করা কি খুব সহজ ছিল? রানার তিহার জেল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পেছনে বেশ শক্তিশালী কোন হাত নিশ্চয় ছিল, না হলে তা কোন দিন সম্ভব হত না। এখানে রানার গতিবিধির সাথে র এর গুপ্তচরদের গতিবিধির যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়। এই ভাবেই তারা ট্রেনিং নিয়ে অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু এবং ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করে সে আফগানিস্থানের ভিসা হাতে পায়। এই ভিসা তৈরি করার পেছনেও অদৃশ্য এক হাত কাজ করছিল। রানা সাথে যা কিছু ঘটছিল তা অন্য কারুর মস্তিষ্ক প্রসূত ছিল। আফগানিস্থান পৌঁছে রানা তালিবানদের সাথে যোগদান করেন এবং সেখানে থাকতে শুরু করে। এইসময় পৃথ্বীরাজের সমাধির ওপর কি ধরনের নোংরামো চলে সে তার ভিডিও করে এবং কিছু দিন তালিবানদের সাথে থেকে রানা তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে সমর্থ হয়। সুযোগ বুঝে রানা এক রাতে পৃথ্বীরাজের কবর খুঁড়ে তার দেহাবশেষ বার করার কাজ শুরু করে। এই কাজ এক দিনে সম্ভব হয় নি। তার জন্য তিন দিন সময় লাগে। তখন গজনীতে চারপাশে বরফ, তাই কারুর সন্দেহ হয় নি। নিজের কাজের প্রমাণ সে ভিডিওতে তুলে রাখে। এরপর রানা দেশে ফিরে তার মায়ের সাহায্যে গাজিয়াবাদের পিলখুয়া গ্রামে পৃথ্বীরাজের মন্দির তৈরি করেন যেখানে ভারতের এই বীর সন্তানের দেহাবশেষ রাখা হয়। যাই হোক। এরপর এই কাজ শেষ করে তিনি আবার তিহার জেলে ফিরে আসেন।

শের সিং রানার এই ঘটনা বলার পর একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, পৃথ্বীরাজের শরীরের অংশ যখন সে ভারতে নিয়ে আসে তখন সুরক্ষা কর্মীদের চোখে ধুলো সে দেয় কি করে। ভারতে এসে পৃথ্বীরাজের মন্দির প্রতিষ্ঠা করার পর সে আবার গ্রেফতার হয় এবং সে এখন মুক্ত এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ইন্টার্ভিউ দিচ্ছেন। আর এই উদ্দেশ্য পুড়নের জন্য যে ট্রেনিং তাকে দেওয়া হয়েছিল তা সে কোথায় এবং কার কাছ থেকে নিয়েছিল।আফগানিস্থানে কোথায় কার কাছে সে আশ্রয় নেবে এবং তালিবানদের সাথে কি করে যোগাযোগ করবে, কিভাবে তার কাজ শেষ করবে সব কিছুর নির্দেশ কোথা থেকে সে পেয়েছে? ভারতের এক গ্রাম্য ছেলে যে দীর্ঘ তিন বছর জেলে ছিল, তার পক্ষে কি করে এ কাজ করা সম্ভব হল? এখন ভারত সরকার কিংবা প্রশাসনের তাকে নিয়ে আর কোন মাথা ব্যাথাও নেই। তবে কি শের সিং রানার পেছনে “র” এর অদৃশ্য হাত ছিল?

✍️লেখা:-দেবশ্রী চক্রবর্তী

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *