ভাঙা শিকারা

✍দেবশ্রী চক্রবর্তী
পর্ব-৫
ওমর যখন কুপওয়ারা বাজারে এসে পৌঁছায়, তখনই ঝিরঝিরে বরফ পরা শুরু হয়ে গেছিল। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এরকম ভাবেই উপত্যকা ধীরে ধীরে সাদা চাদরে আবৃত হয়ে যায়। গুলমার্গ, পহেলগাও সহ কাশ্মীর উপত্যকার বেশ কিছু গ্রামের মানুষ তখন নীচের দিকে নেমে আসতে থাকে। অনেক সময় অত্যধিক বরফ পাতের জন্য পাহাড়ি ধ্বসে বহু মানুষ এবং পালিত পশুর মৃত্যুও হয়।

কুপওয়ারা বাজারে আজ খুব ভিড়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় মানুষ তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে ব্যস্ত। কারন এক টানা বরফ পরলে বাজারের সব দোকান বন্ধ থাকবে। বাজারে গবাদি পশুও বেশ সস্তা দামে এই সময় পাওয়া যায়। পাহাড়ি মানুষ তাদের পোষা ভেড়া, ছাগল, মুরগী সস্তা দামে বিক্রি করে দেয়। কারন নতুন জায়গায় এসে তাদের নিজেদের খাদ্য এবং বাসস্থান সংগ্রহ করতে গিয়ে নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তাঁর ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পোষ্যদের জন্য খাবার সংগ্রহ আরো বড় সমস্যার। এদের খাদ্য না দিলে বেশিদিন বাঁচিয়েও রাখা সম্ভব না। তাই বরফ পড়ার আগে এই সব বাজারে স্থানীয় মানুষরাও চলে আসেন শীতের খাদ্য সংগ্রহের তাগিদে।

বাজারের কোলাহল পার করে ডানদিকে একটা রাস্তা ঢুকে গেছে বনের দিকে। এই পথ দিয়ে পাঁচশো মিটার গেলেই ডানদিকে আরেকটা সরু পথ চলে গেছে, সেখানে গভীর পাইনের বন। জঙ্গলের পথ দিয়ে চলতে চলতে ওমরের সাথে দেখা হল পাহাড়ি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে। এরা সবাই জঙ্গলের পথ দিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসছে। ভেড়ার বিষ্টার সাথে জঙ্গলি গন্ধ মিলেমিশে অদ্ভুত একটা পরিমণ্ডল তৈরি করেছে, যা ওমরকে কাশ্মীরের আদিমতায় আবৃত করে তুলেছে। দাদীর মুখে সে বহু বার শুনেছে তাদের প্রতিবেশী এক মেষ পালকের কথা যে জঙ্গলের পথ দিয়ে মেষ চড়াতে গিয়ে আবিষ্কার করেছিল এক পাহাড়ের ওপর এক বিশাল গুহা। সেই গুহার ভেতরে সে দেখেছিল এক বিশাল তুষার লিঙ্গ। এই ভাবে কয়েকশ বছরের প্রাচীন এক অজানা পথ বেয়ে এক মুসলমান আবিষ্কার করেছিল অমরনাথের তুষার লিঙ্গ। ওমরের মনে হল সে নিজেও আজ কোন অজানা পথে পা দিয়েছে। এ পথ খুব চেনা হলেও আজ তাঁর কাছে বেশ অচেনা।কারন মানুষের উদ্দেশ্যের পরিবর্তনের সাথে সাথে সব কিছুর পরিবর্তন হয়। বহুবার মামুর সাথে এই পথে সে এসেছে, ছোটবেলায় পাহাড়ি পাখি ধরার জন্য মামু এই সব জঙ্গলের আনাচে কানাচে ফাঁদ পেতে রাখতো। কত বন্য মুরগি তাঁরা ধরেছে, যার হিসেব আজ আর মনে নেই। এই বন্যতার তাগিদেই তো কুপওয়ারাতে বারবার ফিরে আসা।

পাইনের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলতে চলতে ডানদিকে একটা সরু পথ চলে গেছে আরো গভীর জঙ্গলে। সেই পথে কেউ এখন আর যাতায়াত করে না। বহু বছর আগে ফাল্গুন মাসের শিবরাত্রির সময় এই পথ ধরে বহু মানুষ যাতায়াত করতেন। কালের স্রোতে সেই সব মানুষেরাও আজ কোথায় হারিয়ে গেছে, এই পথকেও যেন বন্যতা গ্রাস করছে। সরু পথ দিয়ে চলতে চলতে ডানদিকে ভাঙা শিব মন্দিরের চূড়া চোখে পড়ল তাঁর। আশে পাশের পাইনের জঙ্গল থেকে এক টানা বিভিন্ন পাখীর ডাকের মিলিত কলরব ভেসে আসছে। ওমর ধীরে ধীরে জংলী আগাছা গুলো সরিয়ে এগিয়ে চলেছে মন্দিরের দিকে। ভাঙা শিব মন্দিরের কথাই তো বাসের লোকটা বলেছে। এখান থেকেই তো কাল রাত দশটায় তাদের যাত্রা শুরু হবে। এখান থেকে গভীর অরণ্যের মাঝে তাদের হারিয়ে যেতে হবে। যে পথে তাঁরা যাবে সে পথ যে ভয়ঙ্কর এবং অতি দুর্গম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

ওমর দেখল তাঁর সাদা পাজামা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। এতক্ষণ সে লক্ষ্য করেনি, কিন্তু এখন বেশ যন্ত্রণা হচ্ছে। ঝোপের ওপর দিয়ে আসার সময় কাঁটা ঝোপে তাঁর পায়ের অনেকটাই কেটে গেছে। অন্য কোন সময় এরকম কিছু হলে সে অত্যন্ত কাতর হয়ে যেতো। কিন্তু আজ কোন যন্ত্রনাই তাঁকে কাতর করতে পারছে না। আজ কয়েক ঘন্টার মধ্যে সে অনেকটা কঠোর হয়ে উঠেছে।

ওমর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে শিব মন্দিরের চাতালে উঠে বসে নিজের পাজামা গোটাতে গোটাতে আশেপাশের পরিবেশটাকে লক্ষ্য করতে লাগল। যে পথ দিয়ে তাঁকে তাঁর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, সেই পথকে ভালোভাবে চেনার চেষ্টায় মগ্ন হল সে।

ওমর যখন তাঁর ভবিষ্যতের পথে পা বাড়াবে, সেই রাতেই ওমরদের গ্রামে একদল বন্দুকধারীর আগমন হল। রাত সাতটার পর এমনিতেই রাস্তাঘাটে মানুষজন থাকে না, তাঁর ওপর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যখন বরফ পড়া শুরু হয়, তখন এই উপত্যকার গ্রাম্য পথে সন্ধ্যে ছটার পর মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। তবে বিপদে আপদে প্রতিবেশীরা সব প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করেও পাশে থাকে।

দুদিন ধরে প্রায় একটানা বরফ পড়ার পর রাস্তায় প্রায় হাঁটু সমান বরফ জমে গেছে। শাহমল ঘরের ভেতরে বসে তাঁর মুরগীদের দানা খাওয়াচ্ছে, ঘরের এক কোনে রেডিওতে কাশ্মীরি গান হচ্ছে। কাশ্মীরের গ্রাম্য মানুষদের কাছে রেডিও হচ্ছে প্রাণের স্রোত। হাজার রকমের সমস্যার মধ্যেও বিনোদনের এই একমাত্র পথকে আঁকড়ে শাহমলের মতন কয়েকশ মানুষ বেঁচে আছে। পাশের ঘরে দুই মেয়ে বসে পড়াশোনা করছে আর গুলাম খান একটু আগে সন্ধ্যার নামাজ সেরে বিছানার ওপর এসে একটু শুয়েছে। আজকাল খুব ক্লান্ত লাগে তাঁর। বয়স তো কম হল না। তাঁর ওপর ছোট মেয়ের বিয়েটা ঠিকঠাক ভাবে হলে গেলে তাঁর চিন্তাটাও একটু কমে। গুলাম খান শাহমলকে প্রশ্ন করল, খুরম আলি কি বললো তোমাকে? কবে আসবে ছেলেরা?

শাহমল আজকাল কানে কম শোনে, তাঁর ওপর রেডিওর গানের জন্য কোন কথা তাঁর কানে গেলনা। তাঁর ওপর স্ত্রীর কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে গুলাম খান বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন।

-আরে, এতো মহা মুস্কিল, ঘরের মহিলার যদি সংসারে মন না থাকে তাহলে সে সংসার ধ্বংস হয়ে যায়।

শাহমল এবার সব কথা ঠিকঠাক শুনতে পেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে একবার আড় চোখে তাকাল তাঁর স্বামীর দিকে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কি বললে তুমি? আমার সংসারে কোন মন নেই?

গুলাম খান বলল, না নেই, সারাদিন মুরগী আর রেডিও নিয়ে তুমি ব্যস্ত থাকো। কি কাজ করো ?

কথা গুলো শেষ করে গুলাম খান রেডিওটা বন্ধ করে দিলো।

এখন ঘরের ভেতরটা যেন যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরিণত হল। শাহমল চিৎকার করে বলল, আমি বলছি রেডিওটা চালাও, আর দ্বিতীয়ার বলবো না।

গুলাম খানের মনে হল শাহমলের মুখটা সে ভেঙে দেবে। দিনের পর দিন কিছু না বলে তাঁর সাহস বেড়ে গেছে। গুলাম খান তাঁর আশপাশটা ভালো করে দেখতে লাগলো কোথাও শক্তপোক্ত কিছু আছে নাকি। আজ সে শাহমলকে উচিৎ শিক্ষা দেবেই দেবে।

পাশের ঘরে বাবা মায়ের অবস্থান বুঝতে পেরে জাহানারা তাড়াতাড়ি ছুটে আসে। সে তাঁর বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আব্বু, মাথা ঠাণ্ডা করো। আম্মির ভুল হয়ে গেছে। আমাকে তুমি আম্মু বলো না? আম্মুর কথা শোন, শান্ত হও।

জাহানারা গোলাম খানের মেয়ে হলেও তাঁকে সে মন থেকে সম্মান করে, এত বুদ্ধিমতী মেয়ে তাদের গ্রামে আর দ্বিতীয় নেই। এঁকে ঠিকঠাক পড়াশোনা করালে সে যে একদিন পরিবার এবং গ্রামের নাম উজ্জ্বল করবে তা সে জানে। তাই তো বড় মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে কোন দিন বাঁধা সে দেয়না। গোলাম খানের ওপর জাহানার প্রভাব যাদুর মতন কাজ করল, সে নিমেষে চুপ হয়ে গেলো।

বাবাকে চুপ হতে দেখে তাঁর আব্বুকে খাটে বসিয়ে জাহানারা তাঁর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, আব্বু, শাহানারাকে কাল ওরা দেখতে আসবে। ছেলের শ্রীনগরের সান্ডে মার্কেটে নিজের কার্পেটের দোকান। অবস্থা খুব ভালো।

গোলাম খান দুহাত তুলে ওপরের দিকে তাকিয়ে বলল, “শুকর আল্লাহ কা”।

জাহানারা সম্মতি জানিয়ে বলল, হুম, এখন আল্লাহের মেহেরবানিতে সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যায় তো শান্তি।

শাহমল ফুঁসতে ফুঁসতে রেডিও চালাতে যাবে, এমন সময় শাহানারা পাশের ঘর থেকে ছুটতে ছুটতে এসে বলল, আব্বু, করিমার আব্বুকে কারা যেন রাস্তায় বার করে খুব মাড়ছে।

করিমা আর জাহানারা প্রায় সম বয়সী। করিমা নিজের স্কুটি চালিয়ে কলেজে যায়, সে নিজের মাথা এবং মুখ ঢাকেনা, তাই এর আগে দু দুবার তাঁর বাড়ির বাইরে পোস্টার পড়েছে। কিন্তু করিমা কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে নিজের মতন চলে।

গোলাম খান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এটা তো হওয়ারই ছিল। আজ না হোক কাল সালেমকে তাঁর মেয়ের কর্মফল ভোগ করতেই হত।

গোলাম খান উঠে দাঁড়িয়ে জাহানারাকে বলল, বেটা, আমাকে লঙ কোটটা দাও।

জাহানারার উত্তরের অপেক্ষা না করে শাহমল আবার চিৎকার করে উঠল, সে বলল,

এই লোকটার বোকামির জন্য এবার আমরা এক ঘোরে হবো। তুমি বুঝতে পারছো না, কাদের বিরোধিতা তুমি করতে যাচ্ছ।

গুলাম খান একটু হেসে বলল, আমার নিজের প্রাণের ভয়ে প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়াবো না? ছিঃ এত বড় বেইমান আমি নই।

গুলাম খান বাড়ির বাইরে এসে দেখল কালো ফ্যারন পরা আর কালো দোপাট্টা দিয়ে মুখ ঢাকা চারজন মিলে তাঁর ছোটবেলার বন্ধু সালেমকে খুব মাড়ছে। বন্দুকের বাট দিয়ে মেড়ে তাঁরা সালেমের মুখ থেঁতলে দিয়েছে। চাক চাক রক্ত আশেপাশের বরফের ওপর পরে আছে। তাঁর ওপর হলুদ টর্চের আলো এসে পড়ে লাল রঙটা আরো গাঢ় দেখাচ্ছে। গুলাম খান এগিয়ে এসে বলল,

আপনারা ওকে মাড়ছেন কেন ? কি করেছে ও?

ওদের মধ্যে একজন বলল, আমাদের কাছে খবর আছে এর মেয়ে সেনাবাহিনীর কাছে সব খবর সরবরাহ করে।

গোলাম খান এগিয়ে এসে বলল, আপনাদের খুব ভুল হচ্ছে, দেখুন আমি নিজের দায়িত্বে বলছি, এরা অত্যন্ত ভালো মানুষ, এরকম কাজ এরা কোনদিন করবেন না। আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে।

এবার একটা লোক এগিয়ে এসে বলল, আপনারা কি ভাবেন আমরা ঘাসে মুখ দিয়ে চলি? সেনাবাহিনীর ভেতরেও আমাদের লোক আছে। সে নিজে খবর দিয়েছে যে এ গ্রাম থেকে কোন মেয়ে মেজর রণজিৎ সিংকে ম্যাসেজ করে গ্রামে আসতে বলেছিল। আর এ গ্রামে একমাত্র করিমাকেই রাস্তা ঘাটে মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেখা গেছে, তাহলে ভেবে দেখুন খবরটা কে দিয়েছে।

লোক গুলো করিমাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তখন গোলাম খান ছুটে গিয়ে ওদের বাঁধা দিতে গেলে, ওদের একজন বন্দুকের বাট দিয়ে গোলাম খানের পেটে মাড়ে। যন্ত্রণায় গোলাম মাটিতে বসে পরে।

করিমাকে বাড়ির গোয়ালের ভেতরে পাওয়া যায়। সেখান থেকে ওকে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে একজন বাড়ির বাইরে নিয়ে আসে। আর বাকি তিনজন ওকে লাথি মাড়তে থাকে। করিমা যন্ত্রণায় আর্তনাদ পাহাড় এবং জঙ্গলে প্রতিফলিত হলেও তাঁর প্রতিবেশীদের কাছে পৌঁছল না। গোলাম খান আর সালেম দুজনে মাটির ওপর চারপা ভর দিয়ে গিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদের কপালে লাথি আর বন্দুকের বাটের গুঁতো জোটে।

করিমাকে রাস্তা দিয়ে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয় মকবুল ফিরজির বাড়ির পেছনের আপেল বাগানে। সেখানে করিমার হাত, পা বেঁধে রেখে তাঁর মাথার পেছনে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে পর পর দশটা গুলি করা হয়।

করিমাকে যখন গুলি করা হয়, জাহানারা তাঁর ঘরের দুটি ট্রাঙ্কের মধ্যে পিঠ ঠেকিয়ে মোবাইল ফোনটা বুকে চেপে আর্তনাদ করে ওঠে। তাঁর মনে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে নিরীহ করিমাকে জড়িয়ে ধরে সে নিজের শরীরে গুলি গুলো নেবে। কিন্তু মানুষ যে বড় বেইমান জীব। নিজের পিঠ বাঁচানোর জন্য সে সব কিছু করতে পারে। তাই জাহানারার আর্তনাদ তাঁর চার দেওয়ালের মাঝেই আবদ্ধ রয়ে গেলো।

পর্ব- ৬

অন্ধকার হাইওয়ের ধারে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। দোকানের রেডিওতে গান হচ্ছে “মুসাফির হু ইয়ারো, না ঘর হে না ঠিকানা”। এই দোকানটা প্রায় সারা রাত চলে। আর একটু পর থেকে ট্রাক ড্রাইভারদের ভিড় জমবে। বাল্বের হাল্কা আলো আর অন্ধকারের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।এরকম পরিবেশ মানুষের মধ্যে হতাশার জন্ম দেয়। চায়ের কাপটা একটু বেশি গরম। বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায়না। তাই বেঞ্চের ওপর রেখে নিকিতা ঘড়ির দিকে তাকালো, ঘড়িতে রাত সাতটা বাজে। আর দশ মিনিট পর তাঁর জম্মুতে ফেরার বাস। পরিবেশ আর পরিস্থিতি মনের মধ্যে একটা হতাশার জন্ম দিচ্ছে। গত কয়েক দিনের মতন আজকের দিনটাও শেষ হল। কিন্তু নিজের উদ্দেশ্যের সফলের দিকে সে কিছুতেই এগোতে পারল না। একজন মানুষও কথা বলতে ইচ্ছুক না, কেউ তো কিছু বলুক। এইভাবে উনত্রিশ বছরের দীর্ঘ বিড়ম্বনার পর কেউ তো এগিয়ে আসুক। না হলে কি করে হবে।

নিকিতা চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিলো। বড্ড বেশি গরম। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে এই চা শেষ না করলে শেষ বাসটাও চলে যাবে। তারপর সারা রাত তাঁকে রাস্তায় কাটাতে হবে। যাদের জন্য তাঁর এত দূর ছুটে আসা, তারাই তো তাঁকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

কথা গুলো ভাবতে ভাবতে নিকিতা চায়ের কাপে চুমুক দিলো। এত গরম চা এত তাড়াতাড়ি শেষ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। ছোটবেলা থেকেই ও একটু এরকম। একটু নরম সরম গোচের মেয়ে। কোন কিছুর পেছনে লেগে থাকা ওর ঠিক আসে না। খুব তাড়াতাড়ি তাই হাল ছেড়ে দিয়ে সে দোকান থেকে বেড়িয়ে পড়ল।

এই সময় এই অঞ্চলটা বেশ অন্ধকার থাকে। রাস্তার ওপারে কাশ্মীর থেকে আগত পণ্ডিতদের টাউনশিপ।বিশাল গেটের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা, ” ওয়েলকাম টু জাগতি মিনি টাউনশিপ ফর কাশ্মীরি মাইগ্রেন্ট”। সেখান থেকে ছোট ছোট জোনাকির দানার মতন আলো আসছে। নিকিতা খুব তাড়াতাড়ি রাস্তা পার করে ওপারে গিয়ে দাঁড়ালো। ওপার থেকেই ওকে বাসে উঠতে হবে। আজ বাসটা আসতেও দেরি করছে। নিকিতার এখানে আসতে আর ভালো লাগে না। যে কাজের জন্য তাঁর আসা, তা তো হয় না, তাঁর ওপর এত রাত করে বাড়ি ফেরা দিন দিন অসহ্য হয়ে উঠছে।

নিকিতা এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখল টাউন শিপের গেটের বাইরে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে ওকে একভাবে দেখছে। রাস্তা পার করার সময় সে কারুকে দেখেনি। হঠাৎ করে এরকম একজনের উপস্থিতি ওকে খুব ভয় পাইয়ে দিলো। বৃদ্ধ নিজেও যেন নিকিতার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি নিকিতার কাছে এসে বললেন, আমাকে ভয় পেয়ো না। তোমাকে কয়েকদিন এখানে ঘোরাঘুরি করতে দেখে একটু কথা বলতে এলাম।

নিকিতার মনে হল ও কোন স্বপ্ন দেখছে। এত দিন হন্যে হয়ে ও এখানে ঘুরেছে, কেউ কোন কথার উত্তর দেয়নি, আজ কি করে তা সম্ভব হল। নিকিতা বৃদ্ধের কাছে এসে বলল, নমস্কার আমি নিকিতা রায়। আমি কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিয়ে একটা বই লিখছি। তাই আপনাদের সাথে কথা বলাটা আমার খুব দরকার।

বৃদ্ধ একটু ধীরে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, কি জানতে চাও বলো?

-না, না মানে, আপনাদের এইভাবে চলে আসা, কেন চলে এলেন এটাই জানতে চাই।

-আচ্ছা, কেন চলে এলাম এসব তো ঠিক আছে, কিন্তু তুমি কি জানো এই স্যোসাইটির নাম কি?

নিকিতা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, না মানে , জাগতি টাউনশিপ।

বৃদ্ধ এবার একটু হাসলেন। অন্ধকারে বৃদ্ধের মুখের অভিব্যক্তি বোঝা যায়না। তবে বড্ড বেশি নীরবতা যেন নিকিতাকে ঘিরে ধরল। আবার সেই হতাশা। বৃদ্ধের প্রশ্নের ঠিক উত্তর সে দিতে পারেনি। এবার বোধয় বৃদ্ধ তাঁকে আর কোনভাবে সাহায্য করবে না।

দূর থেকে বাসের আওয়াজ আসছে। জম্মু ফেরার শেষ বাস। এই বাস চলে গেলে সারা রাত তাকে রাস্তায় কাটাতে হবে। নিকিতা বৃদ্ধের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাসের দিকে তাকালো। নিস্তব্ধ পরিবেশে বাস এসে দাঁড়াল তাঁর সামনে, নিকিতা বাসে উঠতে যাবে, এমন সময় পেছন থেকে বৃদ্ধ কথা বলে উঠলেন। উত্তরটা জেনে যাও, দাঁড়াও।

নিকিতার বাস চলে গেলে সে আর ফিরতে পারবে না, তবে উত্তরটাও ওকে জানতে হবে, নিকিতা তাঁর একটা পা বাসের পাদানিতে রেখে পেছন ফিরে তাকালো।

বৃদ্ধ এগিয়ে এসে বললেন, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বর্তমান ঠিকানার নাম “ঔরঙ্গজেব’স ড্রিম”। বুঝেছো? এবার তুমি যাও।

নিকিতা বাসে উঠে সামনের তিনটে সিট বাদ দিয়ে জায়গা পেয়ে গেলো। কিন্তু মনে মনে সে একটা কথাই ভাবতে লাগলো এরকম নামকরণের পেছনে কি কারণ থাকতে পারে।

বাসের ভেতরটা বেশ অন্ধকার, একটা হাল্কা আলো জ্বলছে, সবার মুখ দেখা যায়না। কোনক্রমে আন্দাজে সিট বুঝে যাত্রীরা বসছে। বাসের যাত্রী সংখ্যাও বেশি না, হাতে গুনে সাত আটজন হবে। নিকিতার সামনের সিটে দুজন বসে আছে। আর বাকি সব পেছনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ওর পাশের সিটটা ফাঁকা। কিছুক্ষণ বেশ নিস্তব্ধ পরিবেশ ছিল, হঠাৎ পেছনের সিট থেকে দুটি ছেলে পাঞ্জাবী ভাষায় গান জুড়ল,” ও ছোটা দেবর, ভাবি নাল লড় আয়ো রে”।

ক্রমশ গানের সুর চড়া হচ্ছে দেখে নিকিতা পেছন ফিরেতে গিয়ে দেখে ওর অন্য দিকের সিটে বসে থাকা ছেলেটি গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন,কিন্তু ওর বাঁদিকের বুকের বোতামটা খুলে গেছে, আর সেখান থেকে একটা বন্দুক বাইরে বেরিয়ে আছে। বাইরে থেকে আসা আলোতে যেটুকু দেখা যায়, নিকিতা ভালো করে দেখলো। না সে ভুল দেখেনি। সত্যিই লোকটার বুকের ভেতর থেকে বন্দুক বেরিয়ে আছে। নিকিতার মনে হল মাঝের ফাঁকা জায়গাটায় একটা ক্রিকেট বলের মতন কিছু ঘুরপাক খাচ্ছে। নিজের চোখকে ওর বিশ্বাস হচ্ছে না, ও বুঝতে পারছে নিজের অজান্তে এমন একটি বাসে যাত্রীরা উঠে বসেছেন, যেখানে বেশ কিছু আতঙ্কবাদী তাদের সহ যাত্রী। পেছনে যারা গান গাইছে, তাঁরা তাদের সঙ্গীকে সচেতন করার চেষ্টা করছে।

পেছনের আরেকজন যাত্রী গান ধরল, “বন কুন ত্রাও নাজারা, চান্দন তি দি তাচান্দা”। (মেঝের দিকে তাকাও আর তোমার পকেট খোঁজো।)

বাসের ক্লান্ত যাত্রীরা এদের সাথে এক সাথে গান ধরল আর ঠিক তখন পাশের সিটের যাত্রী সজাগ হয়ে নিজের বুকের বোতাম ঠিক করতে লাগলো আর তাঁর পাশের ছেলেটি মেঝের থেকে বলের মতন জিনিশটি তুলে গলা মেলাতে লাগলো।

নিকিতা জানে এরকম সময়ে নির্বোধের মতন বসে থাকাই ভালো, তাঁর কোনরকম ব্যাবহারের প্রভাব নিরীহ যাত্রীদের ওপর এসে পড়বে।

জম্মু বাস ডিপোতে যখন বাস এসে পৌঁছল, তখন সেই বাসে নিকিতা আর গোটা পাঁচেক যাত্রী ছিলো। সে ঠিক করল সবাই নেমে যাবার পর সে নামবে। এরকম সুযোগ সচারচর পাওয়া যায় না। তাঁর উপন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেসব রশদ তাঁর চাই, তা আজ নিজে থেকেই তাঁর সামনে এসে ধরা দিচ্ছে। বাস ডিপোর থেকে হাল্কা আলো এসে ঢুকছে বাসের ভেতরে। একটা রহস্যময় ইন্দ্রজাল রচিত হয়েছে। প্রথম সিটে বসা দুই যাত্রী নেমে গেলে পেছনের সিটে থাকা তিনটি ছেলে ধীরে ধীরে বাসের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। নিকিতা হাল্কা আলোর মধ্যে মুখ গুলো চিনে রাখার চেষ্টা করছে। তিন জনের মধ্যে পেছনের ছেলেটি পেছন ফিরে ডাক দিলো, ফয়সল, আজ কি বাসেই কাটিয়ে দিবি নাকি?

কথাটা শেষ করে ছেলেটি এক ঝলক নিকিতার দিকে তাকিয়ে হাসল। নিকিতা এখন ছেলেটির মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। তবে ছেলেটির মুখ গম্ভীর হয়ে গেলো, সে তাড়াতাড়ি মুখ সরিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ল। নিকিতার পাশের সিটের দুজন যাত্রী এবার খুব সাবধানে উঠে দাঁড়াল। যেন কোন কিছু অত্যন্ত
গোপনে সাড়তে চাইছে তাঁরা, তাই সব যাত্রীদের চলে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। নিকিতাকে বাস থেকে নামতে না দেখে ফয়সল নামের ছেলেটি তাঁকে বলল,

ম্যাম, আপনি যাবেন না?

নিকিতা কোন কথা না বলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলেটির দিকে। এই দৃষ্টির দৃঢ়তার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। ছেলেটি মাথা নীচু করে বসে থাকল। কিন্তু পাশের ছেলেটি তাঁর কানে কিছু বলার পর ফয়সল উঠে বাসের দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। বাসের দরজা দিয়ে ফয়সল নীচে নেমে গিয়ে একবার তাকালো জানালার দিকে।

এক মুখ কালো দাড়ির মাঝে উজ্জ্বল দুটি চোখের গভীরতা নিকিতাকে আকৃষ্ট করল। এই পাঁচ জনের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা গল্প আছে, কিন্তু ফয়সলের চোখের মধ্যে ভয়ঙ্কর কিছু লুকিয়ে আছে। এই ভয়ঙ্করতা মধ্য তাঁকে ঢুকতে হবে।

নিকিতা লক্ষ্য করেনি, ধীরে ধীরে বহু যাত্রী বাসটাতে উঠতে শুরু করেছে। একটি ছেলে তাঁকে সিট থেকে উঠে যাওয়ার জন্য বলছে। নিকিতা বাস থেকে নেমে দেখল কন্ডাক্টর দাঁড়িয়ে আছে নীচে, নিকিতা তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, এই বাসটা কোথায় যাবে?

কন্ডাক্টর বলল, পাঠানকোট যাবে ম্যাম।

নিকিতা এক কোনে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে জল খেলো। তাঁর পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। নানারকম চিত্র ওর মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে, ফয়সল এবং তাঁর সঙ্গীরা কি চায়? ওদের কাছে যা অস্ত্র আছে, তাতে বড়সড় হামলার প্রস্তুতি নিয়ে ওরা ফিরে এসেছে। এরকম পরিস্থিতিতে ওর কি করা উচিৎ, একবার পুলিশের কাছে যাবে? না চুপচাপ বাড়ি ফিরে যাবে। ওর কাছে “ফয়সল” নামটা ছাড়া আর কোন প্রমানও তো নেই। তাঁর কথা কেউ বিশ্বাস করবেই বাঁ কি করে। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে নিকিতা এগিয়ে চলেছে, এমন সময় পেছন থেকে খুব জোড়ে একটা আওয়াজ হলো। চারিদিক আলোকিত হলে জমি কেঁপে উঠল। নিকিতা প্রায় ছিটকে গিয়ে পাশের লোহার পিলারে ধাক্কা খেয়ে পরে গেলো। সে পেছন ফিরে দেখে পাঠানকোট গামী বাসটি দাউদাউ করে জ্বলছে। মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসছে চারপাশ থেকে। মানুষজন নিরাপদ দূরত্বে সরে যাচ্ছে।

নিকিতা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। তাঁর মুখ দিয়ে অস্ফুট ভাবে একটি নাম উচ্চারিত হল, “ফয়সল”।

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *