ভাঙা শিকারা (পর্ব ১৬)

দেবশ্রী চক্রবর্তী

গত রাত থেকে উপত্যকা গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। টেলিফোন, ইন্টারনেট এবং কেবেল টিভি কোন কিছুই কাজ করছেনা। উপত্যকাবাসী সন্ত্রস্ত হয়ে প্রহর গুনছে। গত দুন দিন ধরে বিশাল সংখ্যক বাহিনী উপত্যকায় প্রবেশ করেছে। যেদিকে চোখ যায় সশস্ত্র প্রহরীদেরই শুধু চোখে পড়ছে। কোন বড়সড় পরিবর্তন যে হতে চলেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। কিন্তু কি হতে চলেছে তা তাঁরা যখন জানতে পারলো তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে। উপত্যকা থেকে ৩৭০ ধারা নাকি তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু কারুকে কোন কিছু না জানিয়ে এইভাবে কেন তুলে নিলো এই নিয়ে চিন্তিত কিছু পরিবার। কিন্তু বাকিরা রাস্তার ধারে বসে আলোচনা করছেন, এই ৩৭০ ধারা আসলে কি। তাঁদের নেতারা তাঁদের বুঝিয়েছেন যে এই ৩৭০ ধারা কাশ্মীর থেকে উঠে গেলে কাশ্মীরের সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু মানুষ ভাবছেন সর্বনাশের আর কি কিছু বাকি আছে? ৩৭০ ধারা থেকেও সাধারণ কাশ্মীরিরা কি ভালো ছিল। কিন্তু এরপর কি আরো সর্বনাশ কিছু হবে? এই নিয়ে কিছু বৃদ্ধ ডাল লেকের ধারে আলাপ আলোচনা করছিল।

আজ রাস্তাঘাট খালি, দোকানপাসার সব বন্ধ, চারদিকে থমথমে পরিবেশ। শুধু সেনাদের দেখা যায়। তাঁরা বৃদ্ধদের দেখে কিছু বলছেন না। দূর থেকে একজন ধীরে ধীরে এসে বৃদ্ধদের সামনে দাঁড়ালেন। অযাচিত একজনকে দেখে বৃদ্ধরা তাকালেন, তখন আগন্তুক হাত জোড় করে বললেন, নমস্কার, আমি সুনীল। যাবার পথে আপনাদের আলোচনা শুনে খুব ভালো লাগলো, তাই ভাবলাম, একটু কথা বলে যাই।

বৃদ্ধরা হাসিমুখে আগন্তুককে স্বাগত জানিয়ে বললেন, অবশ্যই শুনবো তোমার কথা, এসো বসো আমাদের সাথে।

সুনীল নিজের ঝোলা ব্যাগটা কাঁধ থেকে কোলের ওপর রেখে বলল, ৩৭০ ধারার ইতিহাসটা কেউ কি জানেন?

এ ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকলো। তখন একজন বৃদ্ধ বললেন, আমাদের ভারতের মধ্যে রেখে দেওয়ার জন্য কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, সেই সুবিধাই ৩৭০।

আচ্ছা, তাহলে আমি আপনাদের ভালো করে বুঝিয়ে বলি, শুনুন।

আজ যা ঘটেছে তা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আমার জ্ঞানে যে টুকু আছে তা দিয়ে আপনাদের বোঝানোর চেষ্টা করি।

১৯৪৭ এ যখন পুরো দেশ স্বাধীন হলো তখন কাশ্মীর চলে গেলো শেখ আব্দুল্লার হাতে।
শেখ আবদুল্লা চাইছিলেন কাশ্মীরে এমন ডেমোক্রেসি আসুক যেখানে কন্সটিটিউশনাল মোনার্কি থাকবে ব্রিটিশদের মত। রাজা আছে কিন্তু ক্ষমতা থাকবে না। সেখানে ভোটে জিতে আসা শেখ হবেন ক্ষমতাসীন রাজনেতা। তাই তিনি ‘টু নেশন’ থিয়োরিতে দেশ ভাগ হওয়ার পরেও ৭৭% মুসলিম পপুলেশন নিয়ে কাশ্মীরকে ভারত ভুক্তির সমর্থন করেন।

দেশ ভাগের আগে ‘ট্র্যান্সফার অফ পাওয়ারে’র সাথে সাথে ‘ট্রান্সফার অফ পপুলেশনে’র কথাও ফাইনাল হয়ে গেছিল। কিন্তু নেহেরু-গান্ধীর মত ছিল ভারত যদিও ভাগ হচ্ছে ধর্মের ভিত্তিতে, কিন্তু থাকবে সেকুলার হিসেবেই। মুসলিম পপুলেশন নিজেরাই ঠিক করবে কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে। ভারতের মুসলমান পপুলেশন সমান সুযোগ সুবিধা পাবে। কিন্তু নীতি ঠিক থাকলেও নিয়ত বা সদিচ্ছা কিন্তু সেরকম ছিল না। তাই কাশ্মীর এক মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্য হয়েও যখন ভারতে যোগ দিল বা দিতে বাধ্য হলো, তখন তাকে আবার নতুন করে কনশেশন দিতে শেখ চাইলেন একটা ‘ফায়ার ওয়াল’।
আর ইন্ডিয়া সেটা মেনে নিল। তারই নাম আর্টিকেল ৩৭০।

এই আর্টিকেল ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল। কাশ্মীরের আলাদা সংবিধান আছে, যেটা অন্য আর কোনও রাজ্যের নেই। কাশ্মীরের সংবিধানে কিন্তু এই ধারা ৩৭০ নেই। বরং বলা হয়েছে ঐ আর্টিকেল ৩৭০ কে চেঞ্জ করতে গেলে কাশ্মীরের সংবিধান কমিটির সুপারিস নিতে হবে। আর ষাটের দশক থেকে সেই সংবিধান কমিটিও নেই!

১৯৪৮ এ শেখ হলেন প্রধান মন্ত্রী। ভারতবর্ষের মধ্যেই আরেকটা প্রধান মন্ত্রী। আর্টিকেল ৩৭০ তৈরির রাস্তা প্রশস্ত হলো। তখন থেকেই কাশ্মীরকে স্পেশাল এলাউন্স দেওয়া শুরু হয়।

ইন্সট্রুমেন্টেশন অফ এক্সেশন সই হয়ে গেছিল বাকি রাজাদের মতো ৪৯’সালের অক্টোবর মাসে। তাতে কোনো স্পেশাল প্রভিশন ছিল না। তবুও সেখ, নেহেরুর কাছে দরবার করলেন। যেহেতু মুসলিম প্রধান রাজ্য হয়েও কাশ্মীর ইন্ডিয়াতে যোগ দিয়েছে সুতরাং একটু আলাদা করে তাদের দেখতেই হবে; আলাদা আইডেন্টিটি রাখতেই হবে। ইন্ডিয়ার অন্য মুসলিমদের সাথে কাশ্মীরী মুসলমানদের এক নিক্তিতে মাপলে চলবে না।

নেহেরু তাকে পাঠালেন সংবিধান ড্রাফটিং কমিটির চেয়ারম্যান আম্বেডকর এর কাছে। আম্বেডকর সব দেখে শুনে বললেন, একটা দেশ জন্ম নিচ্ছে ‘সেকুলার, ডেমোক্রেটিক হিসাবে, আর তার সাথে তুমি আমাকে বিদ্রোহ করতে বলছ! সেখানে তুমি ‘হরিদাস পাল’ চাইছ তোমাকে রিলিজিয়নের খাতিরে এক্সট্রা সুবিধা পাইয়ে দিতে! আমি পারবো না। যে দেশে সবাই সমান সুযোগ পাবে সেখানে কাশ্মীর তার থেকে বেশি পাবে কেন? কাশ্মীরী সারা দেশে গিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে, অথচ দেশের বাকি লোক কাশ্মীরে গিয়ে জমি কিনতে পারবে না। স্থায়ী ভাবে বাস করতে পারবে না। এ আমি পারব না।’

আম্বেডকর সাহেব তখন দেশের তপশীল জাতি উপজাতি’দের সেই ধরনের এক্সট্রা সুবিধা পাইয়ে দিতে উন্মুখ। কিন্তু কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তার মতামত অন্য।

শেখ ফিরে এলেন নেহেরুর কাছে। নেহেরু কাশ্মীরী পণ্ডিত। তাতে শেখ এর পরিবারের সাথে ‘মোতি’ উকিলের অনেক দিনের সম্পর্ক। তাই প্যাটেল কে আইডিয়া দিলেন, এই লিস্ট কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে পাস করিয়ে নিতে। কারন সংবিধান ড্রাফটিং কমিটির অনেকেই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার। সেখানেও ওয়ার্কিং কমিটি একযোগে এর বিরোধীতা করলে নেহেরু-শেখ এর চাল ভণ্ডুল হয়ে গেল। প্যাটেল তখন গৃহ আর উপপ্রধান মন্ত্রী। নেহেরু বিদেশ যাচ্ছিলেন। তার আগে পোর্টফোলিও হীন ক্যাবিনেট মন্ত্রী গোপাল স্বামী আইংগার কে ডেকে বলে গেলেন, যে ভাবেই হোক এই আর্টিকেল ৩৭০ কে সংবিধান কমিটিতে পাস করাতে হবে।

তখনো দেশ পুরো স্বাধীন হয় নি। প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় নি। তার আগেই এই ধরনের চাপ আসতে শুরু। প্রধানমন্ত্রী’র চাপে উপ প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘ঠিক আছে, করিয়ে দিচ্ছি আপনি কিন্তু পরে পস্তাবেন। প্রধান মন্ত্রীর অর্ডার পালন করে আর্টিকেল ৩৭০ কে পাস করান হলো একটা প্রিফেক্স দিয়ে, ‘টেম্পোরারি আর ট্রাঞ্জিয়েন্ট’ মানে অস্থায়ী ধারা’ যাকে কিছুদিনের মধ্যে চলে যেতে হবে।

৭০ বছর ধরে অস্থায়ী, এখন কেউ এর ব্যাপারে কথাও বলতে চায় না। এর সাথে ৩৭১ A, B এই সব রেফারেন্স দেয়। আবার ধারা ৩৫ A আসলে কাশ্মীরের নাগরিকত্ব কে দর্শায়। অনেক লোক আছে যারা লোকসভা তে ভোট দিতে পারে কিন্তু বিধান সভাতে পারেনা। তাদের ছেলেরা সরকারি স্কুলে পড়তে পারে না, স্কলারশিপ পায় না। এই দুই আর্টিকেল মিলে ঠিক করে কাশ্মীরের নাগরিক কারা হবে। আমাদের দেশের সংবিধানে সেকুলার স্ট্রাকচারের মধ্যেই কাশ্মীরের জন্য আলাদ একটা সংবিধান আছে। ১৯৫৬ সালে এই রিগ্রেসিভ ডকুমেন্ট তৈরি হয়। এতে সবার জন্য ফান্ডামেন্টাল রাইট নেই। আর্টিকেল ৩৫A ’যে কি আর সেটা কী ভাবে এলো কেউ জানেতেই পারেনি। সুপ্রীম কোর্ট আজ এই আর্টিকেলের সোর্স খুঁজে দেখছে। সংবিধানের সাথে কোথাও এই আর্টিকেল বিরোধীতা তো করছে না।

এই ভাবে কাশ্মীরের এক সুফি আউলিয়া বিচার ধারা যেখানে হিন্দু-মুসলিম মসজিদ-মন্দির একসাথে গুরুত্ব পেত, গান গেয়ে আল্লা কে ডাকা হত সেটাকে আজ ওয়াহাবি মত ধারা ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে। কারন প্রথম থেকেই একটা সাব ন্যাশনাল আইডিয়া কে সাপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। এমন একটা ভাব ছিল যেন কাশ্মীরীরা ইন্ডিয়াতে এসে ইন্ডিয়াকে মেহেরবানি করেছে। এই ‘সাব ন্যাশনালিজম’ আজ প্রো-পাকিস্তানী, সেপারাটিস্ট ইডিওলজিকে হাওয়া দিচ্ছে। গোপাল স্বামী আইঙ্গার ইন্ডিয়ার ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন তার আগে রাজা হরি সিং এর কাছে এডভাইজার হিসেবে কাজ করতেন বা কংগ্রেসের হয়ে দালালী যাই বলুন না কেন। তার অবদান এই ৩৭০ টেম্পোরারী ধারা। এর ফলে ভারতীয় পার্লামেন্টের অধিকাংশ আইন পাস হয় যেটা কাশ্মীর কে বাদ দিয়ে করা হয়। কাশ্মীরের জন্য বিধান সভা থেকে সমস্ত আইন পাস করাতে হয়। ভারতীয় জন সাধারণ কাশ্মীরে গিয়ে জমি কিনতে পারবে না। কাশ্মীরের ঝান্ডা আলাদা, এমার্জেন্সি পাওয়ার আলাদা। গোপাল স্বামী আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছিলেন কাশ্মীর যেহেতু ডিসপিউটেড ছিল তাই তার ইউনিকনেসের জন্য এই আর্টিকেল ৩৭০ আনা হয়।

কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে থাকেন, তারপর বলেন, তাহলে এই শেষ আব্দুল্লাই এসব কাজ করেছিল, তাও নিজের স্বার্থে।

হুম, পুরোটাই নিজের স্বার্থে করেছিল। আসলে কাশ্মীরের সমস্যার মূল কিন্তু হিন্দু মুসলিম সমস্যা না। এর মূল অন্য জায়গায়।

আরেক বৃদ্ধ বলল, তোমাকে বেশ বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে, অনেক কিছু জানো, আমাদের আরেকটু বুঝিয়ে বলো।

সুনীল বলল, এবার ভারত সরকারের দেওয়া সব সাহায্য যা অন্য রাজ্যের মানুষ ভোগ করে তা এখানকার মানুষও ভোগ করবে। ছেলে মেয়েরা স্কলারশিপ পাবে, পড়াশুনায় উন্নতি হবে, শিল্প হবে, বেকার সমস্যা আর থাকবে না। এখানকার মেয়েরা অনেক কিছু থেকে বঞ্জিত ছিল। এবার আর তা হবে না, ওরা সব রকম আইনি সুযোগ সুবিধা পাবে। বিশেষ করে কন্যা সন্তান হলে তার জন্ম থেকে সব দায়িত্ব সরকারের। আরো অনেক সুবিধা আছে, যা এতদিন কাশ্মীরিরা পাননি, এবার পাবেন।

এই যে ভয়ঙ্কর অবস্থা এর পুরো ইতিহাসটা আপনাদের ভালো করে বরং বলি।

কাশ্মীরি মানুষজন খুব সহজ সরল প্রকৃতির হয়। তাঁরা সামান্য ভালোবাসা পেলে উজাড় করে দিতে জানে। সুনীলের ব্যাবহারে বৃদ্ধরা যেন মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁরা বললেন বলো। আমরা শুনতে চাই তোমার কথা।

সুনীল বলল, ভূস্বর্গ কাশ্মীর। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর কাশ্মীরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন “ পৃথিবীতে স্বর্গ থেকে থাকলে তা এখানে, তা এখানে, তা এখানে” সেই সৌন্দর্য হয়তো আজও আছে কিন্তু বোমা, বন্দুকের গুলিতে কাশ্মীর আজ অশান্ত। মৌর্য সম্রাট অশোক কাশ্মীর এর রাজধানী শ্রীনগরের গোঁড়া পত্তন করেন খ্রিস্ট পূর্ব ৩য় শতাব্দীতে। তখন বৌদ্ধ ধর্ম ছিল এলাকার প্রধান ধর্ম। ৮ম শতাব্দীর শেষে বা নবম শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে বিখ্যাত হিন্দু পণ্ডিত শঙ্করাচার্য কাশ্মীর এ আসেন। কথিত আছে সারদাপীঠ মন্দিরের চারটি দরজা ছিলো, দক্ষিণ এর দরজা সব সময় বন্ধ থাকত,যাতে দক্ষিণ দিক থেকে কোন পণ্ডিত আসতে না পারে। কিন্তু শঙ্করাচার্য তর্ক যুদ্ধে মন্দিরের পুরোহিতদের পরাজিত করে দক্ষিণ দিক দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেন। অভিনব গুপ্ত ছিলেন দশম শতাব্দীতে কাশ্মীর এ জন্ম নেওয়া পণ্ডিত। কাশ্মীরে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে। মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তান থেকেদুলুচা ৬০ হাজার সৈন্য নিয়ে জজিলা গিরিপথ দিয়ে কাশ্মীর দখল করে নেন। দুলুচা তার চলার পথে সব নগর গ্রাম ধ্বংস করে দেয়। বস্তুত এই সময় থেকেই কাশ্মীরে হিন্দু রাজত্বের সমাপ্তি হয়।

হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে রাজা রিনিন প্রথম মুসলিম শাসক হন। এই সব শাসকদের মধ্যে কেউ ছিলেন সহনশীল,কেউ ছিলেন অন্য রকম। সিকন্দর বুশতি খান ছিলেন ভয়ানক অত্যাচারী। তিনি সমস্ত মন্দিরের মূর্তি ভেঙে ফেলেন এবং হিন্দু ধর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। অনেক কাশ্মীরি পণ্ডিত এই সময় কাশ্মীর ছেড়ে পালান,কেউ কেউ আত্ম হত্যা করেন। ১৫৮৫ তে কাশ্মীর মুঘল শাসনের অধীন আসে। মোঘলদের থেকে পরে কাশ্মীর চলে যায় আফগান দূরবাণী সম্রাট দের হাতে।

১৮১৯ এ শিখ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময় গো হত্যা নিষিদ্ধ, আজান,মাদ্রাসা সব নিষিদ্ধ করে মুসলিম বিরোধী কাজ শুরু হয়।
পৌরাণিক কাহীনি এবং নাম করন- কাশ্মীর শব্দের অর্থ হল শুকিয়ে যাওয়া ভূমি। অনেক অনেক দিন আগে চারদিকে হিমালয় আর পীর পাঞ্জল পাহাড় ঘেরা এই এলাকা ছিল বিশাল এক হ্রদ। রাজা দক্ষ তনয়া সতী’ র হ্রদ নাম অনুসারে নাম ছিল সতীসর। সেই হ্রদে বাস করত এক দৈত্য। নাম তার “জলোদ্ভব” দৈত্যের অত্যাচারে লোকজন থাকত সন্ত্রস্ত। অবশেষে কাশ্যপ ঋষি এগিয়ে এলেন তাদের সাহায্য করতে। কাশ্যপ ছিলেন ব্রহ্মপুত্র মারীচের ছেলে। যে সাতজন মুনি বা ঋষিকে সপ্তর্ষি বলা হয়ে থাকে তাদের একজন হলেন ব্রাহ্মন ঋষি কাশ্যপ। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ অনুসরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন কাশ্যপ। ঋষি কাশ্যপের আবেদনে তুষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণু এগিয়ে এলেন। বিশাল এক শুকর বা বরাহের রূপ নিয়ে গুঁতো দিয়ে ভেঙ্গে ফেললেন এক দিকের পাহাড়। ফলে হ্রদ গেল শুকিয়ে আর মারা গেল সেই দৈত্য । যেখানে শুকর বা বরাহরূপী বিষ্ণু পাহাড় ভেঙ্গেছিলেন তার নাম হল বরাহমুল, যা এখন বারমুল্লা নামে পরিচিত। হ্রদ শুকিয়ে জেগে ওঠা পাহাড় ঘেরা এই উপত্যকাই হল কাশ্মীর উপত্যকা। লোকজনের বসতি গড়ে উঠলো নতুন জেগে ওঠা এই উপত্যকায় । কাশ্যপ ঋষির দেশ বা “কাশ্যপ-মার” থেকে ক্রমশ নাম হল কাশ্মীর। ঋষি কাশ্যপের আমন্ত্রণে সারা ভারত থেকে লোকজন এসে বসতি গড়ে তুললো এই উপত্যকায় যারা কালক্রমে হলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত। নিলমত পুরাণ এবং ১২ শ শতাব্দীতে কালহান রচিত গ্রন্থ “রাজতরঙ্গীনি” কাশ্মীর উপত্যকা নিয়ে রচিত আদি গ্রন্থ। চীনা পর্যটক “হিউ-এন-সাং” এর বইয়ে এই এলাকার পরিচয় মেলে “ কা-শি-মি লো” রূপে আর প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসে বলা হত “কাস্পেরিয়া” মহাভারতে উল্লেখ আছে কাম্বোজ রাজাদের অধীন ছিল এই এলাকা। কাম্বোজরা ছিলেন ভারত এবং পারস্য হতে উদ্ভূত জাতি গোষ্ঠী। পাঞ্চাল রাজবংশ রাজত্ব করতেন এই এলাকায় যেখান থেকে পাহাড় শ্রেণীর নাম হয় “পাঞ্জল” পরে মুসলিম শাসনামলে “পীর” শব্দ যুক্ত হয় যা থেকে নাম হল “পীর পাঞ্জল”

১৯৪৭ এ ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলো, কিন্তু কাশ্মীরের মহারাজ হরি সিং তখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না তিনি ভারত না পাকিস্তান কার সাথে যোগ দেবেন । মাউন্ট ব্যাটেন যখন তাঁর কাছে জানতে চান যে তিনি কার সাথে থাকতে চান, হরি সিং জানান কাশ্মীর কারুর সাথে যোগ দেবে না, সে স্বতন্ত্র থাকবে । হরি সিং এর মতন একজন দুর্বল শাসকের পক্ষে কাশ্মীরকে শাসন করা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে । কাশ্মীরের অভ্যন্তরে শুরু হয় অশান্তি । সেই সময় কাশ্মীরি মুসলিমদের এক নেতা জিন্নার কাছে যান কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ কি হবে জানতে । জিনা বলেন, “ কাশ্মীর আমার পকেটে” । ১৯৪৭ এর ২২ এ অক্টোবর পাকিস্তানের আটকোবাদ আর কাশ্মীরের মুজফফরাবাদের মাঝে বয়ে চলা ভয়ঙ্কর নীলম নদী পার করে হাজার হাজার পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি অঞ্চলের ট্রাইবাল দস্যুরা ঢুকে পড়ে কাশ্মীরে । তাঁরা যে অঞ্চলের ওপর দিয়ে যায় খুন, ধর্ষণ, লুঠতরাজ চালাতে থাকেন । পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে যায় হরি সিং কাশ্মীর থেকে পালিয়ে যান । সংবাদপত্র, রেডিও , সারা বিশ্ব থেকে আলাদা হয়ে যায় কাশ্মীর, কি হচ্ছে কাশ্মীরে বাইরের পৃথিবীর কাছে অজানা থেকে যায় । এমনকি কাশ্মীরের মানুষ প্রথম দিকে বুঝতে পারছিলেন না যে কাশ্মীর আক্রান্ত হয়েছে । বারামুল্লার একটি সিনেমা হলকে রেপ সেন্টার বানান হয় । সেখানে হিন্দু মুসলিম ,শিখ, সাই, নির্বিশেষে চলতে থাকে কাশ্মীরি মেয়েদের ধর্ষণ ।
২৬শে অক্টোবর, ১৯৪৭ – জিন্নার অঙ্গুলিহেলনে কাশ্মীরের পশ্চিম অংশের উপজাতীয় বিদ্রোহীরা আর পাকিস্তানি সেনারা কাশ্মীর আক্রমণ করলো, মহারাজের সিদ্ধান্ত নেওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করতে রাজি নয়। তাদের লক্ষ্য মহারাজ কে জোর করে অপসারিত করে কাশ্মীর পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা।ঐ সময় যে স্লোগানটি পাকিস্তানীদের মুখে মুখে ফিরত তা হল “ হসকে লিয়া পাকিস্তান লড়কে লেঙ্গে হিন্দুস্তান” অর্থাৎ হেসে হেসে পাকিস্তান পেয়েছি এবার লড়াই করে হিন্দুস্থান নেবো। এছাড়া জিন্নার শ্লোগান -কাশ্মীর বনেগা পাকিস্তান তো ছিলই। বিদ্রোহীদের অভিযোগ ছিল এই যে মহারাজা হরি সিং ভারতে যোগদানের মতলব আঁটছিলেন। বিদ্রোহীরা মোজাফফরপুর, ডোমেল দখল করে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে পৌঁছে গেল রাজধানী শ্রীনগরের উপকণ্ঠে। পুঞ্চ এ মহারাজা হরি সিং এর বাহিনী হল বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ, জয়ের সাথে সাথে সমানে চলল লুটপাট ও নৃশংস হত্যালীলা। মহারাজা হরি সিং প্রমাদ গুনলেন, বিপদ বুজে তিনি সাহায্য চাইলেন নেহেরুজীর কাছে এবং জানালেন তিনি ভারতের সাথে যুক্ত হতে চান। ২৬শে অক্টোবর, ১৯৪৭, লর্ড মাউন্টব্যাটেন এর উপস্থিতিতে সাক্ষরিত হল “Instrument of Accession”, জম্মু -কাশ্মীর হল এক ভারতীয় রাজ্য। আর ভারতভুক্তির শর্ত হিসাবে জম্মু-কাশ্মীর কে সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা দেবার সংস্থান রাখা হয়। এই বিষয়ে পরে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করছি। আগে দেখে নি সেই সময়ে কি হয়েছিলো? নেহেরুজীর আদেশ অনুসারে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রতি আক্রমণ শুরু করলো হানাদার পাক বাহিনীকে হটানোর জন্যে, শুরু হল স্বাধীনতার পর ভারত এবং পাকিস্তানের প্রথম যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে যখন ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীর ভ্যালির প্রায় দুই- তৃতীয়াংশ পুনরুদ্ধার করে ফেলে বাকী এক-তৃতীয়াংশ এবং গিলগিট, বালতিস্থান উদ্ধারের জন্যে আগুয়ান, জয় যখন প্রায় করায়ত্ত, তখন কোন এক রহস্যময় কারণে নেহেরুজীর আদেশে ভারতীয় বাহিনী মাঝপথে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। নেহেরুজীর এই অমার্জনীয় ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ভারত আজও করে চলেছে। যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার সময়ে পাকিস্তান যে জায়গা দখলে রাখতে সমর্থ হয়েছিলো সেটাই আজকের Pakisthan Occupied Kashmir বা POK, পাকিস্তান অবশ্য বিশ্বের চোখে ধুলো দিতে এর গালভরা নাম দিয়েছে – “আজাদ কাশ্মীর”, যেখানে আজাদির ছিটেফোঁটা নেই, আছে শুধু না পাওয়ার জ্বালা আর তীব্র শোষণ। এরপর সিন্ধু নদ দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে, পাকিস্তান তাঁদের দখলীকৃত কাশ্মীরের একটা অংশ তাঁদের আকা চীন কে উপহার স্বরূপ দিয়েছে, যা আজ Chaina Occupied Kashmir বা COK নামে অধিক পরিচিত।
পাকিস্তান এর পরেও ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালে কাশ্মীর ফিরে পাওয়ার আশায় যুদ্ধ করেছে, আর প্রতিবার শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে শোচনীয় হারের পর পাকিস্তান ভারতের সাথে “সিমলা চুক্তি” করে যেখানে সিদ্ধান্ত হয় কাশ্মীর নিয়ে যাবতীয় শত্রুতা দুই দেশই আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ভাবে মিটিয়ে নেবে। কিন্তু বাস্তবে কি দেখা গেলো? মোটামুটিভাবে ১৯৯০ সাল অবধি কাশ্মীর বেশ শান্তই ছিল, বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ কমই ছিল। ১৯৪৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ন্যাশনাল কনফারেন্স পার্টির শেখ আবদুল্লা, তাঁর পুত্র ফারুক আবদুল্লা, পৌত্র অমর আবদুল্লা, কংগ্রেস পার্টির গুলাম নবী আজাদ এবং পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মুফতি মোহাম্মদ সইদ প্রমুখ। তাহলে ১৯৯০ সালে কি এমন হল? কেনই বা নতুন করে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠল কাশ্মীর উপত্যকায়? এই বিষয়ে সঠিক অনুধাবন করতে গেলে আমাদের কয়েক দশক পিছিয়ে যেতে হবে এবং দেখতে হবে ১৯৭৫ – ১৯৯০ এই সময়ে পাকিস্তান আর আফগানিস্তানে কি হয়েছিলো?
সত্তরের দশকের শেষ দিকে আফগানিস্তানে হানা দেয় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া, সেই সময়ে আমেরিকার সাথে সোভিয়েত রাশিয়ার ঠাণ্ডা যুদ্ধ তুঙ্গে। অতএব আফগানিস্তানে রাশিয়াকে আটকাতে আমেরিকার বোড়ের চাল হয়ে উঠল পাকিস্তান। সবে সামরিক অভ্যুত্থান করে ক্ষমতায় এসেছেন জেনারেল জিয়া উল হক, আমেরিকার হাত তখন তাঁর মাথায়। ডলার আর উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের লোভে পাকিস্তান বিদ্রোহী আফগানদের সাহায্যের জন্যে শুরু করলো জিহাদি ট্রেনিং ক্যাম্প, বেশ কিছু আবার দখলীকৃত “আজাদ কাশ্মীর” অংশে। সেইসব ক্যাম্পে তৈরি হতে লাগলো হাজার হাজার ঈমানী জোশে উদ্বুদ্ধ তালিবান জিহাদি। এই জিহাদি যুবকদের হাতে অস্ত্র জোগানর ভার নিয়েছিল আমেরিকা, পরবর্তীকালে এই সর্বনাশা জোটে এলো সৌদি আরব। আরব ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে তখন বিশ্ব বাজারে হু হু করে বাড়ছে পেট্রো- তেলের দাম, সৌদি রাজবংশের তখন রমরমা অবস্থা, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ আর কি। এই সুযোগে তাঁরা বিশ্ব জুড়ে রপ্তানি করা শুরু করলো ওয়াহাবি ইসলামের বিষ, বিভিন্ন দেশে তখন সৌদি অর্থে তৈরি হচ্ছে একের পর এক মসজিদ। এগুলির মাধ্যমেই সৌদি রাজবংশ ছড়িয়ে দিতে লাগলো তাঁদের ওয়াহাবি প্রোপাগান্ডা। বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ধর্মের ভাইরাস আরে অর্থের সংমিশ্রণে তৈরি এক ভয়ঙ্কর টাইমবম্ব। পাকিস্তানে প্রশিক্ষিত জিহাদি/ মুজাহিদ আফগান, পাঠান ভাইরা তখন আফগানিস্তানে হাজারে হাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, এই যুদ্ধ তাঁদের কাছে তখন ধর্মযুদ্ধের সমান। চিন্তায়, মননে কি ভয়ানক ওয়াহাবি টক্সিন, আর শহিদ হওয়ার পর তাঁদের জন্যে তো আছেই জান্নাত, হুরী ইত্যাদি।
পাকিস্তান তো আনন্দে আটখানা, একদিকে আফগান যুদ্ধে সাহায্য করবার জন্যে আমেরিকা দিচ্ছে কোটি কোটি ডলার, অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র (পরবর্তীকালে যা ব্যবহৃত হবে কাশ্মীর ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যে), অন্যদিকে দেশের বেকার সমস্যার কি চটজলদি সমাধান? দেশের হাজার হাজার যুবক ওয়াহাবি মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে জিহাদি হয়ে উঠছে, সুতরাং তাঁদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের কোন দায় দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হচ্ছে না। পাকিস্তানি আর্মি, আইএসআই এবং ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদ দের বিদেশী ব্যাঙ্ক ভরে উঠছে ডলারে। কিন্তু হায়রে অদৃষ্ট, সময়ের চাকা যে এক জায়গায় থেমে থাকে না এই সত্যটা অনুধাবন করতে পাকিস্তানের নেতৃ বর্গের বোধহয় কষ্ট হয়েছিলো। কারণ ৮০র দশকের শেষদিকে আফগানিস্তান থেকে পিছু হটতে থাকে রাশিয়া, পরবর্তীকালে আমেরিকাও হাত ধুয়ে ফেলে আফগানিস্তান থেকে। পাকিস্তান সমস্যায় পরে তাঁদের নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাঙ্কেনস্তাইন মানে এই জিহাদি দের নিয়ে – যারা ধর্মের নামে মারা আর মরা ছাড়া কিছুই শেখেনি। আসলে বাঘের পিঠে চাপলে অত সহজে তো নামা যাবে না, তাই পাকিস্তান এই জিহাদিদের কিছু অংশকে ভিড়িয়ে দিলো ভারতের কাশ্মীর অংশে, সেই সাথে স্থানীয় কাশ্মীরি যুবকদের মগজ ধোলাই করে তাঁদের হাতে তুলে দিলো অস্ত্র আর মগজে ওয়াহাবি টক্সিনের বিষ। কাশ্মীরি যুবকেরা জিহাদি হয়ে উঠল, শান্ত কাশ্মীরে প্রবেশ করলো টক্সিন ওয়াহাবি মতবাদ। যেখানে কাশ্মীরি মুসলমানেরা এতকাল অনুসরণ করে এসেছে সুফি ইসলাম, শত শত বছর ধরে তাঁরা পাশাপাশি বাস করেছে কাশ্মীরি পণ্ডিত দের সাথে, যা মিলে মিশে সৃষ্টি করেছে এক অসাধারণ অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, যাকে বলা হতো – “কাশ্মিরিয়াত”। হিন্দু কাশ্মীরি পণ্ডিতের বাড়ীর অনুষ্ঠানে পাত পেড়ে খেত কাশ্মীরি মুসলমান, আবার ইদের দিনে কাশ্মীরি মুসলমান ভাইয়ের বাড়ী নিমন্ত্রন থাকত ওই কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারটির। কিন্তু পরবর্তীকালে ধর্মের বিষ মেরে ফেলল এই অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভালোবাসাকে। ১৯৯০ সাল থেকে শুরু হল কাশ্মীরি পণ্ডিত খেদাও অভিযান, মিছিল জমায়েত থেকে আওয়াজ উঠতে লাগলো – “নারায়ে তকদির, আল্লা হো আকবর। পণ্ডিত মহল্লায় হামলার সময় মসজিদের মাইকে আজানের আওয়াজ বহু গুন বাড়িয়ে দেওয়া হল যাতে আর্তনাদ, চিৎকার বাইরে শোনা না যায়। স্লোগান দেওয়া হতে লাগলো – “ হাম ক্যা চাহতে আজাদি কিংবা অ্যায় জালিমো, অ্যায় কাফিরোঁ, কাশ্মীর হমারা ছোড় দো”। হত্যা, অপহরন, লুটপাট, মহিলাদের রেপ কোন কিছুই বাদ গেলো না, ১৯৯০ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পণ্ডিত পরিবার হল কাশ্মীর ছাড়া। বেশির ভাগ আশ্রয় পেল জম্মুতে তৈরি হওয়া আশ্রয় শিবিরে আর বাকিরা ছড়িয়ে পড়ল ভারতের অন্যান্য শহরে। জম্মুর হাঁসফাঁস করা গরমে নোংরা বস্তির এক চিলতে তাঁবুতে কোনমতে সংসার, সরকারের দেওয়া রেশনের চাল-দালের ডোল নিয়ে কোনরকমে ক্ষুন্নিবৃত্তি। এক সময়ে যাঁদের আপেলের বাগান ছিল, দেওদার কাঠের বহুমুল্য আসবাব ছিল তারাই জম্মুতে চরম অসন্মানের জীবন যাপন করে চলেছেন। এখন কাশ্মীরের যে ইতিহাস বলতে যাচ্ছি, সে ইতিহাস জানার জন্য আমাদের পৌঁছে যেতে হবে দেড়শত বছর আগে । কাশ্মীরের ডগরা রাজারা ছিলেন ইংরেজদের বন্ধু, সিপাহী বিদ্রোহের সময়ও তাঁরা ইংরেজদের সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু ইংরেজরা এমন এক জাত যেরা সু দিনে দুর্দিনের বন্ধুকে মনে রাখে না । বিপদ কেটে যেতেই ইংরেজরা ভুলে গেলেন ডগরা রাজবংশের উপকার । ততদিনে ইংরেজরা বুঝতে পেরেগেছিলেন কাশ্মীরের সামরিক গুরুত্ব । রাশিয়ার জারকে রুখতে গিলগিটে দুর্গ প্রতিষ্ঠা করতেই হবে , শুরু হয়ে গেল কূট কৌশল , রনবীর সিং এর বড় ছেলে প্রতাপ সিংহ ছিলেন নেহাত ভালো মানুষ, তিনি ধর্ম কর্মে বেশি মন নিবেশ করলেন , এই সুযোগে ইংরেজরা কাশ্মীরে বসালেন নতুন রেসিডেন্সি । তাঁর কর্তা হয়ে এলেন স্যার অলিভার সেন্ট জন, কাশ্মীরের প্রথম রেসিডেন্ট ।

রাজা প্রতাপ সিং এর ভাই ছিলেন অমর সিং, তাকে ইংরেজরা কাশ্মীরের সিংহাসনের লোভ দেখিয়ে হাত করে নিলেন, ভাই অমর সিং দাদার সরলতার সুযোগ নিয়ে সাদা কাগজে দাদার সি নিয়ে কাশ্মীরের সিংহাসন নিজের নামে লিখিয়ে নিলেন, সারা পৃথিবীর মানুষ জানলেন প্রতাপ সিং ধর্ম কর্মে মন নিবেশ করতে চান, তাই ভাইকে সব সম্পত্তি হস্তান্তর করে দিলেন । দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহ বন্দী থাকার পর প্রতাপ সিংহ একটি চিঠি লিখলেন বড়লাট লর্ড ল্যান্সডাউনের কাছে । মহারাজ লিখলেন তাকে সিংহাসন ফিরিয়ে দেওয়া হোক, কিংবা বুকের মাঝে গুলি করে হত্যা করা হোক । এ অপমান এবং যন্ত্রণার জীবন যে আর তাঁর ভালো লাগে না । কলকাতার খবরের কাগজে কাশ্মীরে ইংরেজদের জালিয়াতির খবর প্রকাশিত হল, পার্লামেন্টে ঝড় উঠল । উদারনৈতিক সদস্য চার্লস ব্র্যাডলে মহারাজের পক্ষ নিলেন, উইলিয়াম ডিগবি ছিলেন সেকালের একজন ন্যায় নিষ্ট ইংরেজ । তিনি মহারাজের প্রতি অবিচারের জোরালো প্রতিবাদ করলেন । অগত্যা ইংরেজ সরকারকে প্রতাপ সিং কে কাশ্মীরের সিংহাসন ফেরত দিতে হয় । ক্রমে মহারাজের চুলে পাক ধরল, চোখে পরল ছানি, মহারাজের কোন পুত্র নাথাকায় মৃত্যু শয্যায় তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্যি দিয়ে গেলেন তাঁর ভাই অমর সিংহের পুত্র হরি সিঙকে ।

হরি সিং সিংহাসনে বসে প্রজাদের মঙ্গলের কথা ভেবে কাজ করতে থাকেন, তিনিই প্রথম ভারতীয় রাজা যিনি লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে গিয়ে বলেছিলেন যে ভারতের শাসনভার ভারতীয়দের হাতেই দেওয়া উচিৎ । ভারতীয় রাজার মুখে এমন কথা ? ইংরেজ সরকার খুশি হলেন না, কাশ্মীরে সাম্প্রদায়িকতার ইন্ধন যুগীয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা শুরু হল ।
ওদের হাতিয়ার ছিল কাশ্মীরের সরল অজ্ঞ মুসলিম প্রজাদের উস্কে দেওয়া । অয়েকফিল্ড নামে একজন ইংরেজ ছিল মহারাজের মন্ত্রী,তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হল কাশ্মীরের মুসলিম প্রজাদের ক্ষেপিয়ে তোলা । কাশ্মীরের মুসলিম প্রজাদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে হিন্দু রাজা এই বলে প্রচার চালাতে থাকেন পাঞ্জাবের অড়হর আর মহম্মদীয়া দোলের নামজাদা সাম্পদায়িক নেতারা এবং কয়েকটি উদুকাগজে তাঁর প্রচার চলতে থাকে । পত্রিকা গুলি বিনা মূল্যে দেওয়া হতে থাকে কাশ্মীরের মুসলমানদের । কাশ্মীরের বুক থেকে উঠে এলো তরুণ শিক্ষিত নেতা শেখ আবদুল্লা ।

ভারতবর্ষের বুকে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়ান হতে থাকে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং আলিগড়ের কলেজের অধ্যক্ষ মিস্টার বেক আর থিওড্র মরিসন সে মাটিতে যুগিয়েছিলেন সাড় ও জল । কাশ্মীরে যখন সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষের চারা বোনার কাজ শুরু হয় তখন মহারাজ বিদেশে ছিলেন , এই সময় প্রথম কাশ্মীরের বুকে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয় ।

এই ঘটনার কয়েক বছর পর আব্দুল্লা গেছিলেন পেশোয়ারের একটি সভায় , সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি দেখলেন একজন মুসলিম জমিদার তাঁর হিন্দু প্রজাদের দিয়ে আমবাগানে কি অমানবিক পরিশ্রম করাচ্ছেন, কেউ যদি ঠিক করে কাজ না করতে পারেন তাঁর পিঠে জুটছে চাবুকের বাড়ি এবং পারিশ্রমিকও কেটে নেওয়া হচ্ছে । এই সময় আব্দুল্লা প্রথম অনুভব করলেন গরিব মানুষের কোন ধর্ম হয় না । পরে তিনি বহু হিন্দু মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন এবং দরিদ্র হিন্দুর মৃত্যু হলে তাঁর শেষকৃত্যের দায়িত্বয়ও নিয়েছিলেন ।

এবার বলব ব্রিগেডিয়ার ওসমাইনের কথা । তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমী, একবার এক সাম্প্রদায়িক মুসলিম নেতা বিলেতে তাঁকে বলেছিলেন ও আপনি জাতিতে মুসলমান, আমিও তাই , জেনে খুব খুশি হলাম,

ওসমাইন বলেছিলেন আমি জাতিতে ভারতীয়, তবে ধর্মের দিকে আমি মুসলিম । দেশভাগের সময় তিনি ছিলেন মুলতানে, দেশভাগের বহু বিভীষিকা লক্ষ্য করেছেন নিজের চোখে । বহু হিন্দু ও শিখ পরিবারকে সাহায্যও করেছেন । গান্ধীজীর হত্যার পর মাছ মাংস ছেঁড়ে দিয়েছিলেন ।

ব্রিগেডিয়ার ওসমাইন পাকিস্তানি দখলদারদের কাছ থেকে কাশ্মীরের নউশেরা,ঝাংগড়, রাজউরী, পুঞ্জ রক্ষা করেছিলেন । যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছিলেন তিনি, পুষ্পস্তবক সাজিয়ে বীরের মৃতদেহ বিমানযোগে নিয়ে আসা হয় দিল্লি । সেখানে হিন্দু,শিখ , খ্রিস্টান,পারসিক, মুসলমানেরা শ্রদ্ধা ভরে ফুল দিয়েছিলেন শবাধারে । জাতীয় পতাকায় ঢেকে কামানের গাড়িতে হল পূর্ণ সামরিক সম্মানে স যাত্রা । শবানুগমন করলেন স্থল, নৌ , বিমানবাহিনীর তিন সরবাধক্ষ ।ব্রিগেডিয়ার সেনের জন্যই পুঞ্জে প্রথম ভারতের পতাকা উত্তলিত হয়, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় ।

একটি বাচ্চা ছেলে এসে একজন বৃদ্ধের কানে কিছু বলল। সুনীল বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বলল, কিবলছে ও?

বৃদ্ধ বললেন, ও আমার নাতি। ক্লাস সেভেনে পড়ে। বলছে সামনে পরীক্ষা, স্কুল কবে খুলবে?

সুনীল ছেলেটির হাত ধরে টেনে নিজের কাছে এনে বলল, বেটা, আর স্কুল বন্ধ থাকবে না। এবার থেকে তোমার শুধু একটাই কাজ, আর তা হচ্ছে, মন দিয়ে পড়াশোনা করে যাও। ঐযে নীল আকাশটা দেখতে পাচ্ছো, এই গোটা আকাশটা এবার তোমার।

সুনীল এবার উঠে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধদের নমস্কার জানিয়ে বলল, আমাকে এবার যেতে হবে, যে কাজের জন্য কাশ্মীরে আমার আসা, সে কাজ আমি সম্পন্ন করেছি। এবার বিদায়।

বৃদ্ধরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে আর সুনীল ধীরে ধীরে ডাল লেকের ধার দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে।

সুনীল যখন কাশ্মীরে নিজের কাজ শেষ করে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন অদিত্রি চারজন বাঙ্গালী মেয়েকে নিয়ে ট্রেনে করে কলতাতার পথে। কোলকাতায় থাকার সময় লেখিকা অদিত্রি ওরফে নিকিতার কাছে খবর আসে যে পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গবির মুসলিম মেয়েদের কাশ্মীরের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি গভীরভাবে প্রভাব ফেলে ওর মনে এবং ওকে দায়িত্ব দেওয়া হয় কাশ্মীর থেকে এইসব নিরীহ মেয়ে গুলোকে উদ্ধার করে আনতে হবে। অদিত্রির মতন এরকম বহু লোকের ওপর গ্রাম ভিত্তিক দায়িত্ব পড়ে এবং তাঁদের সাহায্য করার জন্য দু তিনজন করে ছিলো। অদিত্রি বুলবুল আবাদ গ্রাম থেকে চারজন মেয়েকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে, ওর দায়িত্ব ওদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু পরিবার যদি গ্রহন না করে কিংবা গ্রহন করলেও যদি আবার বিক্রি করেদেয়, তখন মেয়ে গুলোর কি হবে? কথা গুলো ভাবতে ভাবতে সে তার উল্টো দিকে ছেলেটার দিকে তাকালো। ছেলেটি উঠে গিয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখতে গেলো, তখন অদিত্রি হেলান দিয়ে চোখবন্ধ করে ভাবতে লাগলো আকুরা গ্রামের দুটি মেয়ে এসেছিল শ্রীনগরে, তাঁরা ওমর আর কাদের নামে দুজন সেনা জওয়ানের স্ত্রী। উমর আর কাদের দুজনে মুজাহিদ্দিন হতে পাকিস্তানে গেছিল। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে তাঁরা ভারতীয় সেনাতে যোগ দেন। এই মেয়ে দুটি পাকিস্তানী, ওরা বিয়ে করে ওপার থেকে এখানে এসেছে। এখন ওমর আর কাদেরের মুজাহিদ্দিনদের সঙ্গে সংঘাতে মৃত্যু হলে তার স্ত্রীরা পাকিস্তান ফেরত যেতে চাইছেন। কিন্তু তাঁরা ফিরতে পারছে না। এরকম বহু পাকিস্তানী মেয়ে এখানে আঁটকে গেছে। তাঁরা মাঝে মাঝে শ্রীনগর এসে নিজেদের অভিযোগ জানান। এরা কেউ স্বামী পরিত্যক্তা, আবার কারুর স্বামীর সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে। এদের কোন ভবিষ্যৎ নেই। সুবিধাবাদী সমাজ এদের শুষে খাচ্ছে। ওমর আর কাদেরের বৌ ওয়াঘা বর্ডার গেছে। কিন্তু ওখান থেকেও যদি তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তখন তারা কি করবে? এদেশে তো তাদের কেউ নেই। এখানে তাদের একটাই পরিচয় আর তা হচ্ছে, এরা অনুপ্রোবেশকারী। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে অদিত্রির মনে পড়ল আয়েশা নামে একটি এক বছরের মেয়ের কথা। আয়েশা সেনা আর পাথরবাজদের সংঘর্ষের মাঝে চলে এসেছিল। একখন একটা চোখ তার খারাপ। এরকম কয়েক হাজার আয়েশা কাশ্মীর উপত্যকায় আছে কি হবে তাঁদের ভবিষ্যৎ। রাস্তার যেতে যেতে সে খবর পেয়েছে যে ৩৭০ ধারা তুলে নেওয়া হয়েছে, এবার কাশ্মীরের উন্নতি নাকি হবে। সত্যিই কি হবে? অদিত্রি মনে মনে বলল আমার মতন সারা ভারতবাসী কাশ্মীরিদের মঙ্গল চায়, এতজনের মনের ইচ্ছা নিশ্চয়ই পূর্ন হবে।

কথা

গত রাত থেকে উপত্যকা গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। টেলিফোন, ইন্টারনেট এবং কেবেল টিভি কোন কিছুই কাজ করছেনা। উপত্যকাবাসী সন্ত্রস্ত হয়ে প্রহর গুনছে। গত দুন দিন ধরে বিশাল সংখ্যক বাহিনী উপত্যকায় প্রবেশ করেছে। যেদিকে চোখ যায় সশস্ত্র প্রহরীদেরই শুধু চোখে পড়ছে। কোন বড়সড় পরিবর্তন যে হতে চলেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। কিন্তু কি হতে চলেছে তা তাঁরা যখন জানতে পারলো তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে। উপত্যকা থেকে ৩৭০ ধারা নাকি তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু কারুকে কোন কিছু না জানিয়ে এইভাবে কেন তুলে নিলো এই নিয়ে চিন্তিত কিছু পরিবার। কিন্তু বাকিরা রাস্তার ধারে বসে আলোচনা করছেন, এই ৩৭০ ধারা আসলে কি। তাঁদের নেতারা তাঁদের বুঝিয়েছেন যে এই ৩৭০ ধারা কাশ্মীর থেকে উঠে গেলে কাশ্মীরের সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু মানুষ ভাবছেন সর্বনাশের আর কি কিছু বাকি আছে? ৩৭০ ধারা থেকেও সাধারণ কাশ্মীরিরা কি ভালো ছিল। কিন্তু এরপর কি আরো সর্বনাশ কিছু হবে? এই নিয়ে কিছু বৃদ্ধ ডাল লেকের ধারে আলাপ আলোচনা করছিল।

আজ রাস্তাঘাট খালি, দোকানপাসার সব বন্ধ, চারদিকে থমথমে পরিবেশ। শুধু সেনাদের দেখা যায়। তাঁরা বৃদ্ধদের দেখে কিছু বলছেন না। দূর থেকে একজন ধীরে ধীরে এসে বৃদ্ধদের সামনে দাঁড়ালেন। অযাচিত একজনকে দেখে বৃদ্ধরা তাকালেন, তখন আগন্তুক হাত জোড় করে বললেন, নমস্কার, আমি সুনীল। যাবার পথে আপনাদের আলোচনা শুনে খুব ভালো লাগলো, তাই ভাবলাম, একটু কথা বলে যাই।

বৃদ্ধরা হাসিমুখে আগন্তুককে স্বাগত জানিয়ে বললেন, অবশ্যই শুনবো তোমার কথা, এসো বসো আমাদের সাথে।

সুনীল নিজের ঝোলা ব্যাগটা কাঁধ থেকে কোলের ওপর রেখে বলল, ৩৭০ ধারার ইতিহাসটা কেউ কি জানেন?

এ ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকলো। তখন একজন বৃদ্ধ বললেন, আমাদের ভারতের মধ্যে রেখে দেওয়ার জন্য কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, সেই সুবিধাই ৩৭০।

আচ্ছা, তাহলে আমি আপনাদের ভালো করে বুঝিয়ে বলি, শুনুন।

আজ যা ঘটেছে তা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আমার জ্ঞানে যে টুকু আছে তা দিয়ে আপনাদের বোঝানোর চেষ্টা করি।

১৯৪৭ এ যখন পুরো দেশ স্বাধীন হলো তখন কাশ্মীর চলে গেলো শেখ আব্দুল্লার হাতে।
শেখ আবদুল্লা চাইছিলেন কাশ্মীরে এমন ডেমোক্রেসি আসুক যেখানে কন্সটিটিউশনাল মোনার্কি থাকবে ব্রিটিশদের মত। রাজা আছে কিন্তু ক্ষমতা থাকবে না। সেখানে ভোটে জিতে আসা শেখ হবেন ক্ষমতাসীন রাজনেতা। তাই তিনি ‘টু নেশন’ থিয়োরিতে দেশ ভাগ হওয়ার পরেও ৭৭% মুসলিম পপুলেশন নিয়ে কাশ্মীরকে ভারত ভুক্তির সমর্থন করেন।

দেশ ভাগের আগে ‘ট্র্যান্সফার অফ পাওয়ারে’র সাথে সাথে ‘ট্রান্সফার অফ পপুলেশনে’র কথাও ফাইনাল হয়ে গেছিল। কিন্তু নেহেরু-গান্ধীর মত ছিল ভারত যদিও ভাগ হচ্ছে ধর্মের ভিত্তিতে, কিন্তু থাকবে সেকুলার হিসেবেই। মুসলিম পপুলেশন নিজেরাই ঠিক করবে কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে। ভারতের মুসলমান পপুলেশন সমান সুযোগ সুবিধা পাবে। কিন্তু নীতি ঠিক থাকলেও নিয়ত বা সদিচ্ছা কিন্তু সেরকম ছিল না। তাই কাশ্মীর এক মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্য হয়েও যখন ভারতে যোগ দিল বা দিতে বাধ্য হলো, তখন তাকে আবার নতুন করে কনশেশন দিতে শেখ চাইলেন একটা ‘ফায়ার ওয়াল’।
আর ইন্ডিয়া সেটা মেনে নিল। তারই নাম আর্টিকেল ৩৭০।

এই আর্টিকেল ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল। কাশ্মীরের আলাদা সংবিধান আছে, যেটা অন্য আর কোনও রাজ্যের নেই। কাশ্মীরের সংবিধানে কিন্তু এই ধারা ৩৭০ নেই। বরং বলা হয়েছে ঐ আর্টিকেল ৩৭০ কে চেঞ্জ করতে গেলে কাশ্মীরের সংবিধান কমিটির সুপারিস নিতে হবে। আর ষাটের দশক থেকে সেই সংবিধান কমিটিও নেই!

১৯৪৮ এ শেখ হলেন প্রধান মন্ত্রী। ভারতবর্ষের মধ্যেই আরেকটা প্রধান মন্ত্রী। আর্টিকেল ৩৭০ তৈরির রাস্তা প্রশস্ত হলো। তখন থেকেই কাশ্মীরকে স্পেশাল এলাউন্স দেওয়া শুরু হয়।

ইন্সট্রুমেন্টেশন অফ এক্সেশন সই হয়ে গেছিল বাকি রাজাদের মতো ৪৯’সালের অক্টোবর মাসে। তাতে কোনো স্পেশাল প্রভিশন ছিল না। তবুও সেখ, নেহেরুর কাছে দরবার করলেন। যেহেতু মুসলিম প্রধান রাজ্য হয়েও কাশ্মীর ইন্ডিয়াতে যোগ দিয়েছে সুতরাং একটু আলাদা করে তাদের দেখতেই হবে; আলাদা আইডেন্টিটি রাখতেই হবে। ইন্ডিয়ার অন্য মুসলিমদের সাথে কাশ্মীরী মুসলমানদের এক নিক্তিতে মাপলে চলবে না।

নেহেরু তাকে পাঠালেন সংবিধান ড্রাফটিং কমিটির চেয়ারম্যান আম্বেডকর এর কাছে। আম্বেডকর সব দেখে শুনে বললেন, একটা দেশ জন্ম নিচ্ছে ‘সেকুলার, ডেমোক্রেটিক হিসাবে, আর তার সাথে তুমি আমাকে বিদ্রোহ করতে বলছ! সেখানে তুমি ‘হরিদাস পাল’ চাইছ তোমাকে রিলিজিয়নের খাতিরে এক্সট্রা সুবিধা পাইয়ে দিতে! আমি পারবো না। যে দেশে সবাই সমান সুযোগ পাবে সেখানে কাশ্মীর তার থেকে বেশি পাবে কেন? কাশ্মীরী সারা দেশে গিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে, অথচ দেশের বাকি লোক কাশ্মীরে গিয়ে জমি কিনতে পারবে না। স্থায়ী ভাবে বাস করতে পারবে না। এ আমি পারব না।’

আম্বেডকর সাহেব তখন দেশের তপশীল জাতি উপজাতি’দের সেই ধরনের এক্সট্রা সুবিধা পাইয়ে দিতে উন্মুখ। কিন্তু কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তার মতামত অন্য।

শেখ ফিরে এলেন নেহেরুর কাছে। নেহেরু কাশ্মীরী পণ্ডিত। তাতে শেখ এর পরিবারের সাথে ‘মোতি’ উকিলের অনেক দিনের সম্পর্ক। তাই প্যাটেল কে আইডিয়া দিলেন, এই লিস্ট কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে পাস করিয়ে নিতে। কারন সংবিধান ড্রাফটিং কমিটির অনেকেই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার। সেখানেও ওয়ার্কিং কমিটি একযোগে এর বিরোধীতা করলে নেহেরু-শেখ এর চাল ভণ্ডুল হয়ে গেল। প্যাটেল তখন গৃহ আর উপপ্রধান মন্ত্রী। নেহেরু বিদেশ যাচ্ছিলেন। তার আগে পোর্টফোলিও হীন ক্যাবিনেট মন্ত্রী গোপাল স্বামী আইংগার কে ডেকে বলে গেলেন, যে ভাবেই হোক এই আর্টিকেল ৩৭০ কে সংবিধান কমিটিতে পাস করাতে হবে।

তখনো দেশ পুরো স্বাধীন হয় নি। প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় নি। তার আগেই এই ধরনের চাপ আসতে শুরু। প্রধানমন্ত্রী’র চাপে উপ প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘ঠিক আছে, করিয়ে দিচ্ছি আপনি কিন্তু পরে পস্তাবেন। প্রধান মন্ত্রীর অর্ডার পালন করে আর্টিকেল ৩৭০ কে পাস করান হলো একটা প্রিফেক্স দিয়ে, ‘টেম্পোরারি আর ট্রাঞ্জিয়েন্ট’ মানে অস্থায়ী ধারা’ যাকে কিছুদিনের মধ্যে চলে যেতে হবে।

৭০ বছর ধরে অস্থায়ী, এখন কেউ এর ব্যাপারে কথাও বলতে চায় না। এর সাথে ৩৭১ A, B এই সব রেফারেন্স দেয়। আবার ধারা ৩৫ A আসলে কাশ্মীরের নাগরিকত্ব কে দর্শায়। অনেক লোক আছে যারা লোকসভা তে ভোট দিতে পারে কিন্তু বিধান সভাতে পারেনা। তাদের ছেলেরা সরকারি স্কুলে পড়তে পারে না, স্কলারশিপ পায় না। এই দুই আর্টিকেল মিলে ঠিক করে কাশ্মীরের নাগরিক কারা হবে। আমাদের দেশের সংবিধানে সেকুলার স্ট্রাকচারের মধ্যেই কাশ্মীরের জন্য আলাদ একটা সংবিধান আছে। ১৯৫৬ সালে এই রিগ্রেসিভ ডকুমেন্ট তৈরি হয়। এতে সবার জন্য ফান্ডামেন্টাল রাইট নেই। আর্টিকেল ৩৫A ’যে কি আর সেটা কী ভাবে এলো কেউ জানেতেই পারেনি। সুপ্রীম কোর্ট আজ এই আর্টিকেলের সোর্স খুঁজে দেখছে। সংবিধানের সাথে কোথাও এই আর্টিকেল বিরোধীতা তো করছে না।

এই ভাবে কাশ্মীরের এক সুফি আউলিয়া বিচার ধারা যেখানে হিন্দু-মুসলিম মসজিদ-মন্দির একসাথে গুরুত্ব পেত, গান গেয়ে আল্লা কে ডাকা হত সেটাকে আজ ওয়াহাবি মত ধারা ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে। কারন প্রথম থেকেই একটা সাব ন্যাশনাল আইডিয়া কে সাপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। এমন একটা ভাব ছিল যেন কাশ্মীরীরা ইন্ডিয়াতে এসে ইন্ডিয়াকে মেহেরবানি করেছে। এই ‘সাব ন্যাশনালিজম’ আজ প্রো-পাকিস্তানী, সেপারাটিস্ট ইডিওলজিকে হাওয়া দিচ্ছে। গোপাল স্বামী আইঙ্গার ইন্ডিয়ার ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন তার আগে রাজা হরি সিং এর কাছে এডভাইজার হিসেবে কাজ করতেন বা কংগ্রেসের হয়ে দালালী যাই বলুন না কেন। তার অবদান এই ৩৭০ টেম্পোরারী ধারা। এর ফলে ভারতীয় পার্লামেন্টের অধিকাংশ আইন পাস হয় যেটা কাশ্মীর কে বাদ দিয়ে করা হয়। কাশ্মীরের জন্য বিধান সভা থেকে সমস্ত আইন পাস করাতে হয়। ভারতীয় জন সাধারণ কাশ্মীরে গিয়ে জমি কিনতে পারবে না। কাশ্মীরের ঝান্ডা আলাদা, এমার্জেন্সি পাওয়ার আলাদা। গোপাল স্বামী আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছিলেন কাশ্মীর যেহেতু ডিসপিউটেড ছিল তাই তার ইউনিকনেসের জন্য এই আর্টিকেল ৩৭০ আনা হয়।

কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে থাকেন, তারপর বলেন, তাহলে এই শেষ আব্দুল্লাই এসব কাজ করেছিল, তাও নিজের স্বার্থে।

হুম, পুরোটাই নিজের স্বার্থে করেছিল। আসলে কাশ্মীরের সমস্যার মূল কিন্তু হিন্দু মুসলিম সমস্যা না। এর মূল অন্য জায়গায়।

আরেক বৃদ্ধ বলল, তোমাকে বেশ বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে, অনেক কিছু জানো, আমাদের আরেকটু বুঝিয়ে বলো।

সুনীল বলল, এবার ভারত সরকারের দেওয়া সব সাহায্য যা অন্য রাজ্যের মানুষ ভোগ করে তা এখানকার মানুষও ভোগ করবে। ছেলে মেয়েরা স্কলারশিপ পাবে, পড়াশুনায় উন্নতি হবে, শিল্প হবে, বেকার সমস্যা আর থাকবে না। এখানকার মেয়েরা অনেক কিছু থেকে বঞ্জিত ছিল। এবার আর তা হবে না, ওরা সব রকম আইনি সুযোগ সুবিধা পাবে। বিশেষ করে কন্যা সন্তান হলে তার জন্ম থেকে সব দায়িত্ব সরকারের। আরো অনেক সুবিধা আছে, যা এতদিন কাশ্মীরিরা পাননি, এবার পাবেন।

এই যে ভয়ঙ্কর অবস্থা এর পুরো ইতিহাসটা আপনাদের ভালো করে বরং বলি।

কাশ্মীরি মানুষজন খুব সহজ সরল প্রকৃতির হয়। তাঁরা সামান্য ভালোবাসা পেলে উজাড় করে দিতে জানে। সুনীলের ব্যাবহারে বৃদ্ধরা যেন মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁরা বললেন বলো। আমরা শুনতে চাই তোমার কথা।

সুনীল বলল, ভূস্বর্গ কাশ্মীর। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর কাশ্মীরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন “ পৃথিবীতে স্বর্গ থেকে থাকলে তা এখানে, তা এখানে, তা এখানে” সেই সৌন্দর্য হয়তো আজও আছে কিন্তু বোমা, বন্দুকের গুলিতে কাশ্মীর আজ অশান্ত। মৌর্য সম্রাট অশোক কাশ্মীর এর রাজধানী শ্রীনগরের গোঁড়া পত্তন করেন খ্রিস্ট পূর্ব ৩য় শতাব্দীতে। তখন বৌদ্ধ ধর্ম ছিল এলাকার প্রধান ধর্ম। ৮ম শতাব্দীর শেষে বা নবম শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে বিখ্যাত হিন্দু পণ্ডিত শঙ্করাচার্য কাশ্মীর এ আসেন। কথিত আছে সারদাপীঠ মন্দিরের চারটি দরজা ছিলো, দক্ষিণ এর দরজা সব সময় বন্ধ থাকত,যাতে দক্ষিণ দিক থেকে কোন পণ্ডিত আসতে না পারে। কিন্তু শঙ্করাচার্য তর্ক যুদ্ধে মন্দিরের পুরোহিতদের পরাজিত করে দক্ষিণ দিক দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেন। অভিনব গুপ্ত ছিলেন দশম শতাব্দীতে কাশ্মীর এ জন্ম নেওয়া পণ্ডিত। কাশ্মীরে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে। মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তান থেকেদুলুচা ৬০ হাজার সৈন্য নিয়ে জজিলা গিরিপথ দিয়ে কাশ্মীর দখল করে নেন। দুলুচা তার চলার পথে সব নগর গ্রাম ধ্বংস করে দেয়। বস্তুত এই সময় থেকেই কাশ্মীরে হিন্দু রাজত্বের সমাপ্তি হয়।

হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে রাজা রিনিন প্রথম মুসলিম শাসক হন। এই সব শাসকদের মধ্যে কেউ ছিলেন সহনশীল,কেউ ছিলেন অন্য রকম। সিকন্দর বুশতি খান ছিলেন ভয়ানক অত্যাচারী। তিনি সমস্ত মন্দিরের মূর্তি ভেঙে ফেলেন এবং হিন্দু ধর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। অনেক কাশ্মীরি পণ্ডিত এই সময় কাশ্মীর ছেড়ে পালান,কেউ কেউ আত্ম হত্যা করেন। ১৫৮৫ তে কাশ্মীর মুঘল শাসনের অধীন আসে। মোঘলদের থেকে পরে কাশ্মীর চলে যায় আফগান দূরবাণী সম্রাট দের হাতে।

১৮১৯ এ শিখ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময় গো হত্যা নিষিদ্ধ, আজান,মাদ্রাসা সব নিষিদ্ধ করে মুসলিম বিরোধী কাজ শুরু হয়।
পৌরাণিক কাহীনি এবং নাম করন- কাশ্মীর শব্দের অর্থ হল শুকিয়ে যাওয়া ভূমি। অনেক অনেক দিন আগে চারদিকে হিমালয় আর পীর পাঞ্জল পাহাড় ঘেরা এই এলাকা ছিল বিশাল এক হ্রদ। রাজা দক্ষ তনয়া সতী’ র হ্রদ নাম অনুসারে নাম ছিল সতীসর। সেই হ্রদে বাস করত এক দৈত্য। নাম তার “জলোদ্ভব” দৈত্যের অত্যাচারে লোকজন থাকত সন্ত্রস্ত। অবশেষে কাশ্যপ ঋষি এগিয়ে এলেন তাদের সাহায্য করতে। কাশ্যপ ছিলেন ব্রহ্মপুত্র মারীচের ছেলে। যে সাতজন মুনি বা ঋষিকে সপ্তর্ষি বলা হয়ে থাকে তাদের একজন হলেন ব্রাহ্মন ঋষি কাশ্যপ। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ অনুসরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন কাশ্যপ। ঋষি কাশ্যপের আবেদনে তুষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণু এগিয়ে এলেন। বিশাল এক শুকর বা বরাহের রূপ নিয়ে গুঁতো দিয়ে ভেঙ্গে ফেললেন এক দিকের পাহাড়। ফলে হ্রদ গেল শুকিয়ে আর মারা গেল সেই দৈত্য । যেখানে শুকর বা বরাহরূপী বিষ্ণু পাহাড় ভেঙ্গেছিলেন তার নাম হল বরাহমুল, যা এখন বারমুল্লা নামে পরিচিত। হ্রদ শুকিয়ে জেগে ওঠা পাহাড় ঘেরা এই উপত্যকাই হল কাশ্মীর উপত্যকা। লোকজনের বসতি গড়ে উঠলো নতুন জেগে ওঠা এই উপত্যকায় । কাশ্যপ ঋষির দেশ বা “কাশ্যপ-মার” থেকে ক্রমশ নাম হল কাশ্মীর। ঋষি কাশ্যপের আমন্ত্রণে সারা ভারত থেকে লোকজন এসে বসতি গড়ে তুললো এই উপত্যকায় যারা কালক্রমে হলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত। নিলমত পুরাণ এবং ১২ শ শতাব্দীতে কালহান রচিত গ্রন্থ “রাজতরঙ্গীনি” কাশ্মীর উপত্যকা নিয়ে রচিত আদি গ্রন্থ। চীনা পর্যটক “হিউ-এন-সাং” এর বইয়ে এই এলাকার পরিচয় মেলে “ কা-শি-মি লো” রূপে আর প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসে বলা হত “কাস্পেরিয়া” মহাভারতে উল্লেখ আছে কাম্বোজ রাজাদের অধীন ছিল এই এলাকা। কাম্বোজরা ছিলেন ভারত এবং পারস্য হতে উদ্ভূত জাতি গোষ্ঠী। পাঞ্চাল রাজবংশ রাজত্ব করতেন এই এলাকায় যেখান থেকে পাহাড় শ্রেণীর নাম হয় “পাঞ্জল” পরে মুসলিম শাসনামলে “পীর” শব্দ যুক্ত হয় যা থেকে নাম হল “পীর পাঞ্জল”

১৯৪৭ এ ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলো, কিন্তু কাশ্মীরের মহারাজ হরি সিং তখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না তিনি ভারত না পাকিস্তান কার সাথে যোগ দেবেন । মাউন্ট ব্যাটেন যখন তাঁর কাছে জানতে চান যে তিনি কার সাথে থাকতে চান, হরি সিং জানান কাশ্মীর কারুর সাথে যোগ দেবে না, সে স্বতন্ত্র থাকবে । হরি সিং এর মতন একজন দুর্বল শাসকের পক্ষে কাশ্মীরকে শাসন করা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে । কাশ্মীরের অভ্যন্তরে শুরু হয় অশান্তি । সেই সময় কাশ্মীরি মুসলিমদের এক নেতা জিন্নার কাছে যান কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ কি হবে জানতে । জিনা বলেন, “ কাশ্মীর আমার পকেটে” । ১৯৪৭ এর ২২ এ অক্টোবর পাকিস্তানের আটকোবাদ আর কাশ্মীরের মুজফফরাবাদের মাঝে বয়ে চলা ভয়ঙ্কর নীলম নদী পার করে হাজার হাজার পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি অঞ্চলের ট্রাইবাল দস্যুরা ঢুকে পড়ে কাশ্মীরে । তাঁরা যে অঞ্চলের ওপর দিয়ে যায় খুন, ধর্ষণ, লুঠতরাজ চালাতে থাকেন । পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে যায় হরি সিং কাশ্মীর থেকে পালিয়ে যান । সংবাদপত্র, রেডিও , সারা বিশ্ব থেকে আলাদা হয়ে যায় কাশ্মীর, কি হচ্ছে কাশ্মীরে বাইরের পৃথিবীর কাছে অজানা থেকে যায় । এমনকি কাশ্মীরের মানুষ প্রথম দিকে বুঝতে পারছিলেন না যে কাশ্মীর আক্রান্ত হয়েছে । বারামুল্লার একটি সিনেমা হলকে রেপ সেন্টার বানান হয় । সেখানে হিন্দু মুসলিম ,শিখ, সাই, নির্বিশেষে চলতে থাকে কাশ্মীরি মেয়েদের ধর্ষণ ।
২৬শে অক্টোবর, ১৯৪৭ – জিন্নার অঙ্গুলিহেলনে কাশ্মীরের পশ্চিম অংশের উপজাতীয় বিদ্রোহীরা আর পাকিস্তানি সেনারা কাশ্মীর আক্রমণ করলো, মহারাজের সিদ্ধান্ত নেওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করতে রাজি নয়। তাদের লক্ষ্য মহারাজ কে জোর করে অপসারিত করে কাশ্মীর পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা।ঐ সময় যে স্লোগানটি পাকিস্তানীদের মুখে মুখে ফিরত তা হল “ হসকে লিয়া পাকিস্তান লড়কে লেঙ্গে হিন্দুস্তান” অর্থাৎ হেসে হেসে পাকিস্তান পেয়েছি এবার লড়াই করে হিন্দুস্থান নেবো। এছাড়া জিন্নার শ্লোগান -কাশ্মীর বনেগা পাকিস্তান তো ছিলই। বিদ্রোহীদের অভিযোগ ছিল এই যে মহারাজা হরি সিং ভারতে যোগদানের মতলব আঁটছিলেন। বিদ্রোহীরা মোজাফফরপুর, ডোমেল দখল করে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে পৌঁছে গেল রাজধানী শ্রীনগরের উপকণ্ঠে। পুঞ্চ এ মহারাজা হরি সিং এর বাহিনী হল বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ, জয়ের সাথে সাথে সমানে চলল লুটপাট ও নৃশংস হত্যালীলা। মহারাজা হরি সিং প্রমাদ গুনলেন, বিপদ বুজে তিনি সাহায্য চাইলেন নেহেরুজীর কাছে এবং জানালেন তিনি ভারতের সাথে যুক্ত হতে চান। ২৬শে অক্টোবর, ১৯৪৭, লর্ড মাউন্টব্যাটেন এর উপস্থিতিতে সাক্ষরিত হল “Instrument of Accession”, জম্মু -কাশ্মীর হল এক ভারতীয় রাজ্য। আর ভারতভুক্তির শর্ত হিসাবে জম্মু-কাশ্মীর কে সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা দেবার সংস্থান রাখা হয়। এই বিষয়ে পরে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করছি। আগে দেখে নি সেই সময়ে কি হয়েছিলো? নেহেরুজীর আদেশ অনুসারে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রতি আক্রমণ শুরু করলো হানাদার পাক বাহিনীকে হটানোর জন্যে, শুরু হল স্বাধীনতার পর ভারত এবং পাকিস্তানের প্রথম যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে যখন ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীর ভ্যালির প্রায় দুই- তৃতীয়াংশ পুনরুদ্ধার করে ফেলে বাকী এক-তৃতীয়াংশ এবং গিলগিট, বালতিস্থান উদ্ধারের জন্যে আগুয়ান, জয় যখন প্রায় করায়ত্ত, তখন কোন এক রহস্যময় কারণে নেহেরুজীর আদেশে ভারতীয় বাহিনী মাঝপথে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। নেহেরুজীর এই অমার্জনীয় ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ভারত আজও করে চলেছে। যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার সময়ে পাকিস্তান যে জায়গা দখলে রাখতে সমর্থ হয়েছিলো সেটাই আজকের Pakisthan Occupied Kashmir বা POK, পাকিস্তান অবশ্য বিশ্বের চোখে ধুলো দিতে এর গালভরা নাম দিয়েছে – “আজাদ কাশ্মীর”, যেখানে আজাদির ছিটেফোঁটা নেই, আছে শুধু না পাওয়ার জ্বালা আর তীব্র শোষণ। এরপর সিন্ধু নদ দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে, পাকিস্তান তাঁদের দখলীকৃত কাশ্মীরের একটা অংশ তাঁদের আকা চীন কে উপহার স্বরূপ দিয়েছে, যা আজ Chaina Occupied Kashmir বা COK নামে অধিক পরিচিত।
পাকিস্তান এর পরেও ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালে কাশ্মীর ফিরে পাওয়ার আশায় যুদ্ধ করেছে, আর প্রতিবার শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে শোচনীয় হারের পর পাকিস্তান ভারতের সাথে “সিমলা চুক্তি” করে যেখানে সিদ্ধান্ত হয় কাশ্মীর নিয়ে যাবতীয় শত্রুতা দুই দেশই আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ভাবে মিটিয়ে নেবে। কিন্তু বাস্তবে কি দেখা গেলো? মোটামুটিভাবে ১৯৯০ সাল অবধি কাশ্মীর বেশ শান্তই ছিল, বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ কমই ছিল। ১৯৪৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ন্যাশনাল কনফারেন্স পার্টির শেখ আবদুল্লা, তাঁর পুত্র ফারুক আবদুল্লা, পৌত্র অমর আবদুল্লা, কংগ্রেস পার্টির গুলাম নবী আজাদ এবং পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মুফতি মোহাম্মদ সইদ প্রমুখ। তাহলে ১৯৯০ সালে কি এমন হল? কেনই বা নতুন করে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠল কাশ্মীর উপত্যকায়? এই বিষয়ে সঠিক অনুধাবন করতে গেলে আমাদের কয়েক দশক পিছিয়ে যেতে হবে এবং দেখতে হবে ১৯৭৫ – ১৯৯০ এই সময়ে পাকিস্তান আর আফগানিস্তানে কি হয়েছিলো?
সত্তরের দশকের শেষ দিকে আফগানিস্তানে হানা দেয় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া, সেই সময়ে আমেরিকার সাথে সোভিয়েত রাশিয়ার ঠাণ্ডা যুদ্ধ তুঙ্গে। অতএব আফগানিস্তানে রাশিয়াকে আটকাতে আমেরিকার বোড়ের চাল হয়ে উঠল পাকিস্তান। সবে সামরিক অভ্যুত্থান করে ক্ষমতায় এসেছেন জেনারেল জিয়া উল হক, আমেরিকার হাত তখন তাঁর মাথায়। ডলার আর উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের লোভে পাকিস্তান বিদ্রোহী আফগানদের সাহায্যের জন্যে শুরু করলো জিহাদি ট্রেনিং ক্যাম্প, বেশ কিছু আবার দখলীকৃত “আজাদ কাশ্মীর” অংশে। সেইসব ক্যাম্পে তৈরি হতে লাগলো হাজার হাজার ঈমানী জোশে উদ্বুদ্ধ তালিবান জিহাদি। এই জিহাদি যুবকদের হাতে অস্ত্র জোগানর ভার নিয়েছিল আমেরিকা, পরবর্তীকালে এই সর্বনাশা জোটে এলো সৌদি আরব। আরব ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে তখন বিশ্ব বাজারে হু হু করে বাড়ছে পেট্রো- তেলের দাম, সৌদি রাজবংশের তখন রমরমা অবস্থা, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ আর কি। এই সুযোগে তাঁরা বিশ্ব জুড়ে রপ্তানি করা শুরু করলো ওয়াহাবি ইসলামের বিষ, বিভিন্ন দেশে তখন সৌদি অর্থে তৈরি হচ্ছে একের পর এক মসজিদ। এগুলির মাধ্যমেই সৌদি রাজবংশ ছড়িয়ে দিতে লাগলো তাঁদের ওয়াহাবি প্রোপাগান্ডা। বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ধর্মের ভাইরাস আরে অর্থের সংমিশ্রণে তৈরি এক ভয়ঙ্কর টাইমবম্ব। পাকিস্তানে প্রশিক্ষিত জিহাদি/ মুজাহিদ আফগান, পাঠান ভাইরা তখন আফগানিস্তানে হাজারে হাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, এই যুদ্ধ তাঁদের কাছে তখন ধর্মযুদ্ধের সমান। চিন্তায়, মননে কি ভয়ানক ওয়াহাবি টক্সিন, আর শহিদ হওয়ার পর তাঁদের জন্যে তো আছেই জান্নাত, হুরী ইত্যাদি।
পাকিস্তান তো আনন্দে আটখানা, একদিকে আফগান যুদ্ধে সাহায্য করবার জন্যে আমেরিকা দিচ্ছে কোটি কোটি ডলার, অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র (পরবর্তীকালে যা ব্যবহৃত হবে কাশ্মীর ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যে), অন্যদিকে দেশের বেকার সমস্যার কি চটজলদি সমাধান? দেশের হাজার হাজার যুবক ওয়াহাবি মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে জিহাদি হয়ে উঠছে, সুতরাং তাঁদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের কোন দায় দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হচ্ছে না। পাকিস্তানি আর্মি, আইএসআই এবং ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদ দের বিদেশী ব্যাঙ্ক ভরে উঠছে ডলারে। কিন্তু হায়রে অদৃষ্ট, সময়ের চাকা যে এক জায়গায় থেমে থাকে না এই সত্যটা অনুধাবন করতে পাকিস্তানের নেতৃ বর্গের বোধহয় কষ্ট হয়েছিলো। কারণ ৮০র দশকের শেষদিকে আফগানিস্তান থেকে পিছু হটতে থাকে রাশিয়া, পরবর্তীকালে আমেরিকাও হাত ধুয়ে ফেলে আফগানিস্তান থেকে। পাকিস্তান সমস্যায় পরে তাঁদের নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাঙ্কেনস্তাইন মানে এই জিহাদি দের নিয়ে – যারা ধর্মের নামে মারা আর মরা ছাড়া কিছুই শেখেনি। আসলে বাঘের পিঠে চাপলে অত সহজে তো নামা যাবে না, তাই পাকিস্তান এই জিহাদিদের কিছু অংশকে ভিড়িয়ে দিলো ভারতের কাশ্মীর অংশে, সেই সাথে স্থানীয় কাশ্মীরি যুবকদের মগজ ধোলাই করে তাঁদের হাতে তুলে দিলো অস্ত্র আর মগজে ওয়াহাবি টক্সিনের বিষ। কাশ্মীরি যুবকেরা জিহাদি হয়ে উঠল, শান্ত কাশ্মীরে প্রবেশ করলো টক্সিন ওয়াহাবি মতবাদ। যেখানে কাশ্মীরি মুসলমানেরা এতকাল অনুসরণ করে এসেছে সুফি ইসলাম, শত শত বছর ধরে তাঁরা পাশাপাশি বাস করেছে কাশ্মীরি পণ্ডিত দের সাথে, যা মিলে মিশে সৃষ্টি করেছে এক অসাধারণ অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, যাকে বলা হতো – “কাশ্মিরিয়াত”। হিন্দু কাশ্মীরি পণ্ডিতের বাড়ীর অনুষ্ঠানে পাত পেড়ে খেত কাশ্মীরি মুসলমান, আবার ইদের দিনে কাশ্মীরি মুসলমান ভাইয়ের বাড়ী নিমন্ত্রন থাকত ওই কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারটির। কিন্তু পরবর্তীকালে ধর্মের বিষ মেরে ফেলল এই অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভালোবাসাকে। ১৯৯০ সাল থেকে শুরু হল কাশ্মীরি পণ্ডিত খেদাও অভিযান, মিছিল জমায়েত থেকে আওয়াজ উঠতে লাগলো – “নারায়ে তকদির, আল্লা হো আকবর। পণ্ডিত মহল্লায় হামলার সময় মসজিদের মাইকে আজানের আওয়াজ বহু গুন বাড়িয়ে দেওয়া হল যাতে আর্তনাদ, চিৎকার বাইরে শোনা না যায়। স্লোগান দেওয়া হতে লাগলো – “ হাম ক্যা চাহতে আজাদি কিংবা অ্যায় জালিমো, অ্যায় কাফিরোঁ, কাশ্মীর হমারা ছোড় দো”। হত্যা, অপহরন, লুটপাট, মহিলাদের রেপ কোন কিছুই বাদ গেলো না, ১৯৯০ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পণ্ডিত পরিবার হল কাশ্মীর ছাড়া। বেশির ভাগ আশ্রয় পেল জম্মুতে তৈরি হওয়া আশ্রয় শিবিরে আর বাকিরা ছড়িয়ে পড়ল ভারতের অন্যান্য শহরে। জম্মুর হাঁসফাঁস করা গরমে নোংরা বস্তির এক চিলতে তাঁবুতে কোনমতে সংসার, সরকারের দেওয়া রেশনের চাল-দালের ডোল নিয়ে কোনরকমে ক্ষুন্নিবৃত্তি। এক সময়ে যাঁদের আপেলের বাগান ছিল, দেওদার কাঠের বহুমুল্য আসবাব ছিল তারাই জম্মুতে চরম অসন্মানের জীবন যাপন করে চলেছেন। এখন কাশ্মীরের যে ইতিহাস বলতে যাচ্ছি, সে ইতিহাস জানার জন্য আমাদের পৌঁছে যেতে হবে দেড়শত বছর আগে । কাশ্মীরের ডগরা রাজারা ছিলেন ইংরেজদের বন্ধু, সিপাহী বিদ্রোহের সময়ও তাঁরা ইংরেজদের সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু ইংরেজরা এমন এক জাত যেরা সু দিনে দুর্দিনের বন্ধুকে মনে রাখে না । বিপদ কেটে যেতেই ইংরেজরা ভুলে গেলেন ডগরা রাজবংশের উপকার । ততদিনে ইংরেজরা বুঝতে পেরেগেছিলেন কাশ্মীরের সামরিক গুরুত্ব । রাশিয়ার জারকে রুখতে গিলগিটে দুর্গ প্রতিষ্ঠা করতেই হবে , শুরু হয়ে গেল কূট কৌশল , রনবীর সিং এর বড় ছেলে প্রতাপ সিংহ ছিলেন নেহাত ভালো মানুষ, তিনি ধর্ম কর্মে বেশি মন নিবেশ করলেন , এই সুযোগে ইংরেজরা কাশ্মীরে বসালেন নতুন রেসিডেন্সি । তাঁর কর্তা হয়ে এলেন স্যার অলিভার সেন্ট জন, কাশ্মীরের প্রথম রেসিডেন্ট ।

রাজা প্রতাপ সিং এর ভাই ছিলেন অমর সিং, তাকে ইংরেজরা কাশ্মীরের সিংহাসনের লোভ দেখিয়ে হাত করে নিলেন, ভাই অমর সিং দাদার সরলতার সুযোগ নিয়ে সাদা কাগজে দাদার সি নিয়ে কাশ্মীরের সিংহাসন নিজের নামে লিখিয়ে নিলেন, সারা পৃথিবীর মানুষ জানলেন প্রতাপ সিং ধর্ম কর্মে মন নিবেশ করতে চান, তাই ভাইকে সব সম্পত্তি হস্তান্তর করে দিলেন । দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহ বন্দী থাকার পর প্রতাপ সিংহ একটি চিঠি লিখলেন বড়লাট লর্ড ল্যান্সডাউনের কাছে । মহারাজ লিখলেন তাকে সিংহাসন ফিরিয়ে দেওয়া হোক, কিংবা বুকের মাঝে গুলি করে হত্যা করা হোক । এ অপমান এবং যন্ত্রণার জীবন যে আর তাঁর ভালো লাগে না । কলকাতার খবরের কাগজে কাশ্মীরে ইংরেজদের জালিয়াতির খবর প্রকাশিত হল, পার্লামেন্টে ঝড় উঠল । উদারনৈতিক সদস্য চার্লস ব্র্যাডলে মহারাজের পক্ষ নিলেন, উইলিয়াম ডিগবি ছিলেন সেকালের একজন ন্যায় নিষ্ট ইংরেজ । তিনি মহারাজের প্রতি অবিচারের জোরালো প্রতিবাদ করলেন । অগত্যা ইংরেজ সরকারকে প্রতাপ সিং কে কাশ্মীরের সিংহাসন ফেরত দিতে হয় । ক্রমে মহারাজের চুলে পাক ধরল, চোখে পরল ছানি, মহারাজের কোন পুত্র নাথাকায় মৃত্যু শয্যায় তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্যি দিয়ে গেলেন তাঁর ভাই অমর সিংহের পুত্র হরি সিঙকে ।

হরি সিং সিংহাসনে বসে প্রজাদের মঙ্গলের কথা ভেবে কাজ করতে থাকেন, তিনিই প্রথম ভারতীয় রাজা যিনি লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে গিয়ে বলেছিলেন যে ভারতের শাসনভার ভারতীয়দের হাতেই দেওয়া উচিৎ । ভারতীয় রাজার মুখে এমন কথা ? ইংরেজ সরকার খুশি হলেন না, কাশ্মীরে সাম্প্রদায়িকতার ইন্ধন যুগীয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা শুরু হল ।
ওদের হাতিয়ার ছিল কাশ্মীরের সরল অজ্ঞ মুসলিম প্রজাদের উস্কে দেওয়া । অয়েকফিল্ড নামে একজন ইংরেজ ছিল মহারাজের মন্ত্রী,তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হল কাশ্মীরের মুসলিম প্রজাদের ক্ষেপিয়ে তোলা । কাশ্মীরের মুসলিম প্রজাদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে হিন্দু রাজা এই বলে প্রচার চালাতে থাকেন পাঞ্জাবের অড়হর আর মহম্মদীয়া দোলের নামজাদা সাম্পদায়িক নেতারা এবং কয়েকটি উদুকাগজে তাঁর প্রচার চলতে থাকে । পত্রিকা গুলি বিনা মূল্যে দেওয়া হতে থাকে কাশ্মীরের মুসলমানদের । কাশ্মীরের বুক থেকে উঠে এলো তরুণ শিক্ষিত নেতা শেখ আবদুল্লা ।

ভারতবর্ষের বুকে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়ান হতে থাকে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং আলিগড়ের কলেজের অধ্যক্ষ মিস্টার বেক আর থিওড্র মরিসন সে মাটিতে যুগিয়েছিলেন সাড় ও জল । কাশ্মীরে যখন সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষের চারা বোনার কাজ শুরু হয় তখন মহারাজ বিদেশে ছিলেন , এই সময় প্রথম কাশ্মীরের বুকে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয় ।

এই ঘটনার কয়েক বছর পর আব্দুল্লা গেছিলেন পেশোয়ারের একটি সভায় , সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি দেখলেন একজন মুসলিম জমিদার তাঁর হিন্দু প্রজাদের দিয়ে আমবাগানে কি অমানবিক পরিশ্রম করাচ্ছেন, কেউ যদি ঠিক করে কাজ না করতে পারেন তাঁর পিঠে জুটছে চাবুকের বাড়ি এবং পারিশ্রমিকও কেটে নেওয়া হচ্ছে । এই সময় আব্দুল্লা প্রথম অনুভব করলেন গরিব মানুষের কোন ধর্ম হয় না । পরে তিনি বহু হিন্দু মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন এবং দরিদ্র হিন্দুর মৃত্যু হলে তাঁর শেষকৃত্যের দায়িত্বয়ও নিয়েছিলেন ।

এবার বলব ব্রিগেডিয়ার ওসমাইনের কথা । তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমী, একবার এক সাম্প্রদায়িক মুসলিম নেতা বিলেতে তাঁকে বলেছিলেন ও আপনি জাতিতে মুসলমান, আমিও তাই , জেনে খুব খুশি হলাম,

ওসমাইন বলেছিলেন আমি জাতিতে ভারতীয়, তবে ধর্মের দিকে আমি মুসলিম । দেশভাগের সময় তিনি ছিলেন মুলতানে, দেশভাগের বহু বিভীষিকা লক্ষ্য করেছেন নিজের চোখে । বহু হিন্দু ও শিখ পরিবারকে সাহায্যও করেছেন । গান্ধীজীর হত্যার পর মাছ মাংস ছেঁড়ে দিয়েছিলেন ।

ব্রিগেডিয়ার ওসমাইন পাকিস্তানি দখলদারদের কাছ থেকে কাশ্মীরের নউশেরা,ঝাংগড়, রাজউরী, পুঞ্জ রক্ষা করেছিলেন । যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছিলেন তিনি, পুষ্পস্তবক সাজিয়ে বীরের মৃতদেহ বিমানযোগে নিয়ে আসা হয় দিল্লি । সেখানে হিন্দু,শিখ , খ্রিস্টান,পারসিক, মুসলমানেরা শ্রদ্ধা ভরে ফুল দিয়েছিলেন শবাধারে । জাতীয় পতাকায় ঢেকে কামানের গাড়িতে হল পূর্ণ সামরিক সম্মানে স যাত্রা । শবানুগমন করলেন স্থল, নৌ , বিমানবাহিনীর তিন সরবাধক্ষ ।ব্রিগেডিয়ার সেনের জন্যই পুঞ্জে প্রথম ভারতের পতাকা উত্তলিত হয়, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় ।

একটি বাচ্চা ছেলে এসে একজন বৃদ্ধের কানে কিছু বলল। সুনীল বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বলল, কিবলছে ও?

বৃদ্ধ বললেন, ও আমার নাতি। ক্লাস সেভেনে পড়ে। বলছে সামনে পরীক্ষা, স্কুল কবে খুলবে?

সুনীল ছেলেটির হাত ধরে টেনে নিজের কাছে এনে বলল, বেটা, আর স্কুল বন্ধ থাকবে না। এবার থেকে তোমার শুধু একটাই কাজ, আর তা হচ্ছে, মন দিয়ে পড়াশোনা করে যাও। ঐযে নীল আকাশটা দেখতে পাচ্ছো, এই গোটা আকাশটা এবার তোমার।

সুনীল এবার উঠে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধদের নমস্কার জানিয়ে বলল, আমাকে এবার যেতে হবে, যে কাজের জন্য কাশ্মীরে আমার আসা, সে কাজ আমি সম্পন্ন করেছি। এবার বিদায়।

বৃদ্ধরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে আর সুনীল ধীরে ধীরে ডাল লেকের ধার দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে।

সুনীল যখন কাশ্মীরে নিজের কাজ শেষ করে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন অদিত্রি চারজন বাঙ্গালী মেয়েকে নিয়ে ট্রেনে করে কলতাতার পথে। কোলকাতায় থাকার সময় লেখিকা অদিত্রি ওরফে নিকিতার কাছে খবর আসে যে পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গবির মুসলিম মেয়েদের কাশ্মীরের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি গভীরভাবে প্রভাব ফেলে ওর মনে এবং ওকে দায়িত্ব দেওয়া হয় কাশ্মীর থেকে এইসব নিরীহ মেয়ে গুলোকে উদ্ধার করে আনতে হবে। অদিত্রির মতন এরকম বহু লোকের ওপর গ্রাম ভিত্তিক দায়িত্ব পড়ে এবং তাঁদের সাহায্য করার জন্য দু তিনজন করে ছিলো। অদিত্রি বুলবুল আবাদ গ্রাম থেকে চারজন মেয়েকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে, ওর দায়িত্ব ওদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু পরিবার যদি গ্রহন না করে কিংবা গ্রহন করলেও যদি আবার বিক্রি করেদেয়, তখন মেয়ে গুলোর কি হবে? কথা গুলো ভাবতে ভাবতে সে তার উল্টো দিকে ছেলেটার দিকে তাকালো। ছেলেটি উঠে গিয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখতে গেলো, তখন অদিত্রি হেলান দিয়ে চোখবন্ধ করে ভাবতে লাগলো আকুরা গ্রামের দুটি মেয়ে এসেছিল শ্রীনগরে, তাঁরা ওমর আর কাদের নামে দুজন সেনা জওয়ানের স্ত্রী। উমর আর কাদের দুজনে মুজাহিদ্দিন হতে পাকিস্তানে গেছিল। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে তাঁরা ভারতীয় সেনাতে যোগ দেন। এই মেয়ে দুটি পাকিস্তানী, ওরা বিয়ে করে ওপার থেকে এখানে এসেছে। এখন ওমর আর কাদেরের মুজাহিদ্দিনদের সঙ্গে সংঘাতে মৃত্যু হলে তার স্ত্রীরা পাকিস্তান ফেরত যেতে চাইছেন। কিন্তু তাঁরা ফিরতে পারছে না। এরকম বহু পাকিস্তানী মেয়ে এখানে আঁটকে গেছে। তাঁরা মাঝে মাঝে শ্রীনগর এসে নিজেদের অভিযোগ জানান। এরা কেউ স্বামী পরিত্যক্তা, আবার কারুর স্বামীর সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে। এদের কোন ভবিষ্যৎ নেই। সুবিধাবাদী সমাজ এদের শুষে খাচ্ছে। ওমর আর কাদেরের বৌ ওয়াঘা বর্ডার গেছে। কিন্তু ওখান থেকেও যদি তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তখন তারা কি করবে? এদেশে তো তাদের কেউ নেই। এখানে তাদের একটাই পরিচয় আর তা হচ্ছে, এরা অনুপ্রোবেশকারী। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে অদিত্রির মনে পড়ল আয়েশা নামে একটি এক বছরের মেয়ের কথা। আয়েশা সেনা আর পাথরবাজদের সংঘর্ষের মাঝে চলে এসেছিল। একখন একটা চোখ তার খারাপ। এরকম কয়েক হাজার আয়েশা কাশ্মীর উপত্যকায় আছে কি হবে তাঁদের ভবিষ্যৎ। রাস্তার যেতে যেতে সে খবর পেয়েছে যে ৩৭০ ধারা তুলে নেওয়া হয়েছে, এবার কাশ্মীরের উন্নতি নাকি হবে। সত্যিই কি হবে? অদিত্রি মনে মনে বলল আমার মতন সারা ভারতবাসী কাশ্মীরিদের মঙ্গল চায়, এতজনের মনের ইচ্ছা নিশ্চয়ই পূর্ন হবে।

কথা গুলো ভাবতে ভাবতে ট্রেনের গতিও বেড়ে গেলো। অদিত্রি, সুনীল এরা তো কোথাও থেমে থাকে না। এদের চলতেই থাকতে হয়।

গুলো ভাবতে ভাবতে ট্রেনের গতিও বেড়ে গেলো। অদিত্রি, সুনীল এরা তো কোথাও থেমে থাকে না। এদের চলতেই থাকতে হয়।

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *