ভাঙা শিকারা (পর্ব ১২)

✍দেবশ্রী চক্রবর্তী

পহেলগাঁও বাজারের থেকে যে রাস্তাটা গ্রামের ভেতরে ঢুকে গেছে। সেই রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্ত মিলেছে গিয়ে একেবারে নদীর ধারে। নদীর ওপারটা পাহাড় আর জঙ্গল। এপারে সেরকম জনবসতি না থাকলেও দুটো কাঠের বাড়ি আছে। বাড়ি দুটো মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ডানদিকের বাড়ির এক তলায় ভাটেদের রুটির দোকান। সুনীল এই বাড়ির দোতলার একদিকে ভাড়া থাকে। ওর উল্টো দিকের ফ্ল্যাটটা ফাকাই ছিল এতদিন। কিন্তু আজ ও শুনছে, একজন সাহিত্যিক ২০ দিনের জন্য ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিয়েছে আর সে আজ রাতে এসে ঢুকবে। ইসমাইল ভাটের রুটির কদর আছে। তাই সকালের দিকে আর বিকেলের দিকে এই দোকানের বাইরে ক্রেতাদের ভীর থাকে। এই অঞ্চলের মানুষের মতনই সুনীল ভোরে উঠেই ভাটদের রুটির দোকান থেকে লাওয়াসা নামের বিখ্যাত কাশ্মীরি রুটি কিনে তা গোলাপি চায়ের সাথে খায়। গোলাপি চা সে নিজের বাড়িতেই বানায়। তাঁর জন্য বড় তামার একটি পাত্র যাকে সাম্বারা বলে, তা সে সঙ্গে করে কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছে। এই পাত্রটি সুনীলের দাদীর। দাদীর কাশ্মীর ছাড়ার সময় যে কয়েকটি জিনিশ সঙ্গে করে নিয়ে গেছিলেন, তাঁর মধ্যে অন্যতম এই পাত্রটি। আজ সুনীলের ছুটি। কয়েকটা ফাইল দেখার আছে, একটু পরে দেখলেও হবে, তাই সে বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখছে। পহেলগাও কাশ্মীরের সব থেকে সুন্দর জায়গা। এত সুন্দর যে চোখ সরানো যায় না। এর খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে আছে আকর্ষণ। সামনে দিয়ে নদী বয়ে যাচ্ছে। সারা রাত সে এই নদীর আওয়াজ শোনে। যখন সে কাজের মধ্যে অন্য কোথাও থাকে তখনো এই নদীর কলরব সে অনুভব করে। তাঁর বাড়ির সামনের বাড়িটা আব্দুল লোণের। লোণ একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা। সে সারাদিন বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে সভা করে দেশ বিরোধী ভাষণ দেয়, মানুষকে উস্কে দেওয়াই এর কাজ। কাশ্মীরের বহু যুবক এর বক্তৃতায় অনুপ্রাণিত হয়ে মুজাহিদ্দিনের দলে গেছে। গরিবের ছেলেদের জিহাদের মন্ত্র দিলেও সে তাঁর দুই ছেলেকে ছোট বেলা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দিয়েছে পড়াশোনা করার জন্য। সেখানে এখন তাঁরা ডাক্তারি করে, ভুলেও দেশে ফেরে না। তবে লোণ এবং তাঁর স্ত্রী প্রতি বছর অস্ট্রেলিয়ায় যায়। তাদের সেখানে দুই ছেলের নামে দুটি বাড়িও কেনা আছে। কিন্তু এত টাকা কোথা থেকে পায় এই লোণ? তাঁর বাড়ির নীচে লজেন্স আর বিস্কুটের কারখানা আছে। এই কারখানা থেকে কাশ্মীর উপত্যকার সব দোকানে লজেন্স আর বিস্কুট সরবরাহ করা হয়। কিন্তু তবুও এত টাকা আসে কোথা থেকে? লোণকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে সে বলে সব আল্লাহের মেহেরবানি। আব্দুল লোণ না বললেও সবাই সব কিছুই বোঝে। এই অঞ্চলের উন্নয়নের যত টাকা সরকার পাঠায় তা এদের পকেটেই তো যায়। সাধারণ কাশ্মীরিরা গরীব আরও গরীব হচ্ছে আর এই সব নেতাদের পকেট ফুলে ফেঁপে উঠছে। সাধারণ কাশ্মীরিদের জিহাদের মন্ত্র দিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে এরা আর নিজেদের সন্তানদের এসব থেকে বহু দূরে রাখছে। এইভাবে চললে তো কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে। কে সামলাবে কাশ্মীরকে? এইসব লোনেদের অস্ট্রেলিয়াবাসী সন্তানেরা?

কথা গুলো চিন্তা করেই খারাপ লাগে সুনীলের।

সুনীল সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে চলতে লাগলো। আজ সে মহাপারার বাড়ি যাবে। নদীর ওপরে কাঠের পুল পার করে ওপারে গেলেই ওদের বাড়ি। মহাপারা কলেজে পড়ে। ও টিউশন আর সেলাইয়ের কাজ করে নিজের ছোট ভাই, বোনেদের খরচ চালায়। সুনীল অবশ্য কিছুটা সাহায্য ওদের করে। না হলে এই ভাবে একা হাতে সব কিছু চালানো তাঁর পক্ষে সম্ভব হত না।

সুনীলের মহাপারাকে নিজের বোনের মতন মনে হয়, এত অল্প বয়সেও মেয়েটা কত পরিণত। একা নিজের ভাই,বোনেদের খরচ সে চালাচ্ছে, ওর বয়সী অন্যান্য মেয়েরা কত কিছু করে। কিন্তু মহাপারা এসব থেকে অনেক দূরে। সুনীল মহাপারাকে নিজের বোনের মতন দেখলেও মহাপারা কিন্তু সুনীলকে অন্য চোখে দেখে। সুনীলকে দেখলে এক রাশ টিউলিপের গন্ধে তাঁর মন প্রাণ মেতে ওঠে। সুনীলের ছুটি থাকলেই সে তাদের বাড়ি যায়। মহাপারাকে পড়াশোনাও দেখিয়ে আসে। মহাপারা জানে আজ ছুটি আছে, সুনীল ঠিক তাঁর বাড়িতে আসবে। তাই সে জানালার ধারে বসে সেলাই করছে। ঘরদোরও সকাল থেকে পরিষ্কার করে গুছিয়ে রেখেছে।

আজ মহাপারাকে পড়াতে না, মনের ভেতরের একটা খিঁচ সরাতে সুনীল যাচ্ছে তাদের বাড়ি। আব্দুল লোণের কারখানায় মহাপারার বাবা কাজ করতো। তাদের অবস্থাও সে সময় খুব ভালো ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর তাঁর বাবাকে পুলিশ মাদক পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করলো। মহাপারার বাবা গ্রেফতার হবার পর তাদের সংসারটা ভেসে গেলেও আব্দুল লোণের কিছু হয়নি। সে এই পরিবারকে কোনরকম ভাবে সাহায্যও করেনি। তবে মহাপারার বাবার কাছে এত পরিমাণ মাদক এলো কোথা থেকে! কার হয়ে সে মাদক পাচার করতো। এ প্রশ্নের উত্তর তাঁকে জানতেই হবে।

দূর থেকে সুনীলকে আসতে দেখে মহাপারা আয়নার সামনে গিয়ে নিজের মুখটা ভালো করে দেখে নিলো। সে সবার সামনে মাথায় হিজাব দিলেও, সুনীলের সামনে কোনদিন দেয়না। যে পুরুষ তাঁর সংসারের সব দায়িত্ব পালন করছে, সে তো তাঁর স্বামী ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। সুনীল ছাড়া আর কারুর সম্পর্কে সে ভাবেও না।

ডানদিকের খোলা জানালা দিয়ে বরফের পাহাড় দেখা যাচ্ছে। ওরা দুজন মুখোমুখি বসে আছে। ভাই বোন দুটো এখন বাড়ি নেই স্কুলে গেছে। তাই পরিবেশ এবং পরিস্থিতি দুটোই প্রেমের উপযোগী।

মাহাপারার চোখে মুখে কোন সঙ্কোচ নেই, সে তাঁর বাদামি রঙের এক ঢাল চুল খুলে গোলাপি রঙের সালোয়ার কামিজ পরে বসে আছে। বাজার থেকে দুটো নীল রঙের পাথর দেওয়া দুল কিনেছিল, সেগুলো সুনীলের আসার আগে পড়ে নিয়েছে। সুনীল এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। সে ভাবছে এত সুন্দর নিষ্পাপ একটি মেয়েকে খুব সামলে রাখতে হবে। কারণ দিনকাল ভালো না। এর ওপর যেকোনো খারাপ লোকের দৃষ্টি পড়তে পারে।
সুনীল মহাপারার দিকে তাকিয়ে বলল, মহাপারা, আমি তোমাকে এখন যা বলবো তুমি খুব মন দিয়ে শুনবে, আর উত্তরও খুব ভেবে চিন্তে দেবে।

মহাপারা মনে মনে ভাবল, আমি আপনাকে বিন্দুমাত্র মিথ্যে কোনদিন বলিনি, আর কোনদিন তা বলতেও পারবো না।সে মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানালো।

এবার সুনীল একটু ঝুঁকে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার বাবাকে যেদিন পুলিশ গ্রেফতার করল, সেদিন কিংবা তাঁর আগে কোন দিন তোমাদের বাড়িতে কেউ এসেছি?

মহাপারাকে একবারও ভাবতে হলনা। কারণ সেদিনের সব ঘটনা তাঁর ছবির মতন মনে আছে, কোনভাবেই সে তা ভুলতে পারবে না। মাহাপারা বলল, সপ্তাহে দুদিন করে রাতের দিকে একটা ছেলে আসতো, আব্বুকে জিজ্ঞাসা করলে বলতো আবদুল লোণের লোক।
যেদিন আব্বু গ্রেফতার হন, তাঁর আগের দিন সন্ধ্যায়ও ছেলেটি এসেছিল।

সুনীলের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে যা খুঁজছিল, তা সে পেয়ে গেছে। এর অর্থ তাঁর সন্দেহ ঠিকই ছিল।

সুনীল আবার জিজ্ঞাসা করল, ছেলেটি যখন আসতো, সঙ্গে করে কি কিছু নিয়ে আসতো?

মহাপারা সম্মতি জানিয়ে বলল, ছেলেটি যখনই আসতো হাতে করে একটা বাক্স নিয়ে আসতো। আব্বু বাক্সটা ঐ আলমারিতে লুকিয়ে রাখতেন, তারপর পরের দিন
কারখানা যাওয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন।

কারখানা মানে? আবদুল লোণের লজেন্স বিস্কুটের কারখানা?

জি।

সুনীল একটু যেন উত্তেজিত হয়ে উঠল। কোনক্রমে নিজের আবেগকে সংযত করে ও বলল, এই সব চকলেট আর লজেন্সের বিক্রি কেমন, তুমি জানো?

মহাপারা বলল, কাশ্মীর উপত্যকার প্রত্যেক স্কুলের বাইরে যেসব দোকান আছে সব জায়গায় এর খুব বিক্রি। কিন্তু একটা ব্যাপার আমার খুব খারাপ লাগতো, আব্বু এইসব লজেন্স আর বিস্কুট আমাদের খেতে নিষেধ করতেন। বলতেন, কোন বন্ধুও যদি দেয়, আমরা যেন ভুলেও সেই লজেন্স কিংবা বিস্কুট না খাই।

সুনীলের কাছে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল। পুরো চিত্র তাঁর কাছে এখন পরিষ্কার। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া তো কোন কিছু হয় না। কোথায় সে পাবে প্রমাণ?
কাশ্মীরের নতুন প্রজন্ম নেশার অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে চলেছে। যেকোনো ভাবেই হোক তাঁকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও কাজ করতে হবে, না হলে সে কাশ্মীরকে রক্ষা করতে পারবে না। কোনভাবেই না।

সুনীল মহাপারার দুটো হাত শক্ত করে ধরে বলল, মহাপারা, তোমার কাছে আমি কোনদিন কিছু চাইনি। কিন্তু আজ যা চাইবো, আমার কাশ্মীরের জন্য চাইবো। তোমাকে সাহায্য করতেই হবে।

মহাপারা এই সময়ের জন্য এতদিন প্রতীক্ষা করে এসেছে। সে সব সময় দু হাত ভরে সুনীলের কাছ থেকে দান নিয়েছে। কিন্তু প্রতিদানে কোনদিন তাঁকে কিছু দেয়নি। আজ যদি সে কোনভাবে তাঁকে সাহায্য করতে পারে, তাহলে
তাঁর মতন খুশি আর কেউ হবে না।

মহাপারা মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাতেই সুনীল বলল, আমার সাথে তোমাকে পুলিশের কাছে যেতে হবে। তুমি আমাকে একটু আগে যা যা বলেছ, সেই সব কিছু পরিষ্কার ভাবে তোমাকে পুলিশকে জানাতে হবে। তাহলে তোমার বাবাকেও
আমরা খুব তাড়াতাড়ি ছাড়িয়ে আনতে পারবো।

মহাপারা বলল, আপনি আমার আর আমার পরিবারের কাছে ভগবান। তাই আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো। কিন্তু পুলিশের কাছে বয়ান দেওয়ার পর আমি আর এই বাড়িতে একা দুই ভাই বোনকে নিয়ে নিরাপদে থাকতে পারবো না। আমাদের নিরাপত্তার জন্য আপনাকে এখানে থাকতে হবে।

সুনীল বলল, এ আর বলার অপেক্ষা রাখেনা মহাপারা। আমি আমার ভাড়ার বাড়ি ছেড়ে দিয়ে এখানে তোমাদের সাথেই থাকবো। কিন্তু তত দিনই থাকবো যতদিন না তোমার বাবা ফিরে আসছেন।

ভাই বোনেরা স্কুলে গেছে, তাদের আসতে অনেক দেড়ি, তাই মহাপারা সুনীলের সাথে পুলিশ স্টেশনের দিকে রউনা হল। পথে সে একটি ছেলেকে দেখে সুনীলকে বলল,এই ছেলেটার নাম ফয়সল, এই ছেলেটাই তো বাক্স নিয়ে আসতো।

সুনীল ছেলেটাকে দেখে চিন্তে পেরে গেলো, এ আবদুল লোণের ভাগ্নে। মামাকে ব্যবসার কাজে ছেলেটি সাহায্য করে। কিন্তু মাঝে কয়েক মাস ছেলেটিকে সে দেখেনি।

মহাপারা চুপিচুপি বলল, আব্বু গ্রেফতার হবার পর ও অনেক দিন এখানে ছিল না। আজ অনেকদিন পর ওকে দেখলাম।

ফয়সল মহাপারাকে সুনীলের সাথে আড় চোখে একবার দেখে নিয়ে নিজের মত করে পথ চলতে লাগলো।

পুলিশ স্টেশনে জবান বন্দী দিয়ে সুনীল আর মহাপারা প্রথমে গেলো সুনীলের বাড়ি। কারণ সুনীলের পক্ষে একা গোছগাছ করা সম্ভব না। তাই মহাপারা প্রায় জোড় করেই এসেছে।

বাড়িতে ঢোকার সময় ওরা একজন মহিলাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। মহিলা ভাট বেকারির কুলচা ব্রেড আর চা খাচ্ছে।

সুনীল সিঁড়ি দিয়ে উঠে ভদ্রমহিলাকে হাত জোড় করে নমস্কার জানালে, মহিলা বলেন, নমস্কার । আমি নিকিতা। কলকাতায় থাকি।

সুনীল বলল, আরে আমিও তো কলকাতা থেকে এসেছি এখানে চাকরি করতে। আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো।

মহাপারা ভুরু কুচকে সুনীলকে বলল, চলুন পরে কথা হবে, আগে জিনিশ পত্র গুছিয়ে ফেলি। না হলে আমার ভাই বোন গুলোর আসার সময় হয়ে আসছে।

সুনীল মহাপারাকে বলল, তুমি এই টাকাটা নাও। নীচের দোকান থেকে রুটি কিনে বাড়ি গিয়ে কিছু রান্না করো। আমি একটু পরে যাচ্ছি।

মহাপারা একটু বিরক্তির সুরে বলল, আর আপনার গোছগাছ কে করে দেবে? কথাটা বলে সে নিকিতার দিকে তাকালো। নিকিতাও খুব সহজ ভাবে মহাপারার দিকে তাকিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলো।

সুনীল নিজের পার্স থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বার করে মহাপারার হাতে দিয়ে বলল, আমার হাতে এখনো ২০ দিন সময় আছে, ধীরে ধীরে ঘর খালি করতে পারবো, কোন সমস্যা নেই।

সুনীল এরকম কেন করলো, মহাপারা কিছু বুঝতে পারলো না। তাহলে কি ঐ মহিলার প্রতি ওর কোন আকর্ষণ তৈরি হয়েছে, যা ওকে এরকম করতে বাধ্য করল।

মহাপারা চলে গেলে নিকিতা সুনীলকে বলে চা খাবেন?

সুনীল বলে, খাবো, চিনি আর দুধ ছাড়া।

সুনীলের জন্য নিকিতা চা তৈরি করে সুনীলের ঘরে নিয়ে গেলো। নিকিতাকে ভেতরে আসতে দেখে সুনীল দরজার সামনে এসে ভালো করে বাইরেটা দেখে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে একটা টুল নিয়ে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে বসল। নিকিতা সুনীলের হাতে কাপটা দিয়ে বলল,
মেয়েটার কিছু সন্দেহ হয়নি তো?

সুনীল কাপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা পেন ড্রাইভ পেলো, ও সেটা পকেটের ভেতর ঢুকিয়ে বলল, সন্দেহ হতে কতক্ষণ। আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে।

-আপনি এই বাড়ি ছেড়ে দেবেন বলছেন, তাহলে আমি এখানে একা থাকবো?

-আপনার আশাকরি ২০ দিনের মধ্যে সব কাজ হয়ে যাবে। ততদিন আমি এই বাসা ছাড়বো না। এই মেয়েটি আর তাঁর ভাইবোনের ওপর নজরদারি করার জন্য আমার লোকজন আছে।
নতুন কোন খবর?

-জম্মু বিস্ফোরণের ফয়সল আসলে আবদুল লোণের ভাগ্নে। ও এখন এই মুহূর্তে আমাদের সামনের বাড়ির একতলায় আছে।

-হুম খবর পাক্কা, তাছাড়া এখান থেকে সারা কাশ্মীরের সমস্ত স্কুলে মাদক পাচার করা হয়।

-আজ রাতটা তাহলে খুব গুরুত্বপূর্ণ তাই তো।

-হুম, তবে আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে। আপনি এই চুইনগামটা রাখুন। আমার সাথে আর কোন কথা আজ আর আপনার হবে না। শুধু যাবার সময় ব্যালকনির রেলিং এ এই চুইনগানটা চিপকে দিয়ে যান।

নিকিতা উঠে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো। ও বারান্দার রেলিং এর সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।

সুনীল নিজের ল্যাপটপ খুলে পেছনের বালিশে হেলান দিয়ে বসল। সামনের ল্যাপটপের স্ক্রিনে আবদুল লোণের বাড়ি দেখা যাচ্ছে।

ভাট বেকারির থেকে এক ব্যাগ গরম পাউরুটি ইসমাইল ভাট তাঁর কর্মচারী রশিদের হাতে দিয়ে বলল নতুন ভাড়াটিয়ার ঘরে দিয়ে আয়।

রশিদকে এবার বাড়ি ফিরতে হবে, তাই সে ব্যাগটা নিয়ে তাড়াতাড়ি দোতলায় এসে দরজায় ধাক্কা দিলো। নিকিতা কোন প্রশ্ন না করেই দরজা খুলে ব্যাগটা নিয়ে ঘরে চলে গেলো।

খাটের ওপর ল্যাপটপ খোলা, তাতে নিকিতা ঘরের বন্ধ দরজা দেখা যাচ্ছে। সে ব্যাগ থেকে রুটি গুলো খাটের ওপর রাখতে আরম্ভ করল। একটা রুটি খুব ফোলা। সে একটা ছুড়ি দিয়ে সেই শক্ত রুটিটা কাটতেই তার ভেতর থেকে একটা রিভলভার বেড়িয়ে এলো।

নিকিতা পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার জন্য নিজের ল্যাপটপে কাশ্মীরি সুফি গান চালালো। সেই গান ঘরের বন্ধ দরজা ভেত করে বাইরের ফাঁকা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে। ইসমাইল ভাট সে গান গুনগুন করে গাইতে গাইতে দোকান বন্ধ করছেন।
রশিদ নামের ছেলেটি পহেলগাও বাজারে থাকে, ও সাইকেলে বেল দিতে দিতে গ্রামের পথ ধরে চলে গেছে। এখন এই গ্রামের চারপাশ খুব থমথমে, নদীর ছন্দময় কলকলানির সাথে সুফি সংগীতের মিশ্রণে এক অসাধারণ মনোরম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আর কোন কিছুর শব্দ শোনা যাচ্ছে না।

মহাপারার মন আজ ভালো নেই। সুনীলের ব্যবহারে সে অসন্তুষ্ট, এত রাত হয়ে গেলো, এখনো সুনীলের আসার নাম নেই, নানারকম খারাপ চিন্তা তার মাথা ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। নতুন মহিলা আর সুনীলকে নিয়ে সে অনেক কিছু চিন্তা করছে। ভাই বোনেদের খাইয়ে সে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। এখন, সে জানালার ধারে বসে সুনীলের অপেক্ষা করছে।
জানালা বন্ধ। কিন্তু কাঁচের জানালার বন্ধ পাল্লা দিয়ে বাইরের সব কিছু পরিষ্কার দেখা যায়। মহাপারা এখন নদীর ধারে ওপারের জঙ্গলের মধ্যে একটু নড়াচড়া দেখতে পাচ্ছে। মনে হচ্ছে একদল মানুষ যেন অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলেছে।
মহাপারার খুব ভয় করছে। সে আজ পুলিশের কাছে আবদুল লোণ আর ফয়সলের বিরুদ্ধে জবানবন্দী দিয়ে এসেছে, এত রাতে তাঁর পরিবারের ওপর যদি আক্রমণ হয়, তাহলে কি হবে? সে আর সময় অপচয় না করে সুনীলকে ফোন করল।

সুনীল মহাপারার সব কথা শুনে বলল, মহাপারা, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না কি বলো?

মহাপারা সুনীলের সাথে কথা বলার সময় বুঝলো যে ও এতক্ষণ সুনীলের সম্পর্কে যা কিছু ভেবেছে সব মিথ্যে। সুনীল এর মতন একজন মানুষকে অবিশ্বাস করে সে জীবনের সব থেকে বড় ভুল করেছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি নিজের থেকে বেশি আপনাকে বিশ্বাস করি।

সুনীল নিজের বাঁ হাতের নখ খুটতে খুটতে বলল, মহাপারা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, তোমার কোন ক্ষতি আমি চাইনা। তাই বলছি, তুমি আর বাইরের দিকে তাকিয়ো না, খাওয়াদাওয়া করে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি কাল সকালে তোমার কাছে যাবো। কাল সারা দিন তোমার সাথে থাকবো।

মহাপারার কাছে এটুকুই অনেক বড় পাওয়া। সুনীল তাঁকে ভালোবাসে, সে নিজে মুখে তা স্বীকার করেছে, এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?

সে খাওয়া দাওয়া করে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

নদীর ধার থেকে একদল এগিয়ে আসছে গ্রামের দিকে। তাঁরা খুব সাবধানে এগিয়ে আসছে। কারণ গ্রামের মানুষকে তাঁরা জানাতে চায় না তাদের আগমনের খবর। খুব সাবধানে তাঁরা এগিয়ে আসছে। গ্রামের মানুষ জেনে গেলে তাদের লক্ষ্য পূর্ণ হবেনা। তাই তাঁরা অত্যন্ত সাবধান ভাবে এগিয়ে আসছে। দূর থেকে
নদীর ধারে একটি বাড়িতে আলো দেখা যাচ্ছে, সেই বাড়িটি থেকে সুফি সঙ্গীতের সুর ভেসে আসছে। এই বাড়ির উল্টোদিকের বাড়ির একতলায় তাদের ঢুকতে হবে।

লোক গুলো বাড়িটাকে সম্পূর্ণভাবে ঘিরে ধরে, আর কেউ এই বাড়ি থেকে কোথাও পালাতে পারবে না। চারিদিক থেকে বাড়িটাকে ঘিরে ধরে বেরোনোর পথের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে চারজন দাঁড়িয়ে থাকল। এবার একজন মাইক হাতে তুলে নিয়ে বলল, আবদুল লোণ তুমি আর তোমার ভাগ্নে ফয়জল লোণকে আমরা মাদক পাচার আর জম্মু
বাস স্ট্যান্ডে বিস্ফোরণের মূল চক্রী হিসেবে গ্রেফতার করছি। তোমরা বাড়ির ভেতর থেকে বেড়িয়ে এসো।

এতক্ষণে এ গ্রামের সবাই জেনে গেছে যে গ্রামে সেনা ঢুকেছে। বড় সড় কোন এনকাউন্টার হতে চলেছে। সবাই সচেতন রয়েছে। কিন্তু আবদুল লোণের বাড়িতে সেনা হানা দিয়েছে, এটা তাদের কাছে খুব বিস্ময়কর লেগেছে। কারণ আবদুল লোণ লোকটা ভালো, ওর কারখানায় কাজ করে এখানকার গ্রামের বহু মানুষের সংসার চলে। তবে যারা ওর কারখানায়
কাজ করে তাঁরা একটুও অবাক হয়নি, কারণ তাঁরা জানতো যে একদিন না একদিন এই আক্রমণ হবারই ছিলো।

কিছুক্ষণ প্রায় নিস্তব্ধ, আবার সেনার পক্ষ থেকে এনাউন্স করতে যাবে এমন সময় স্প্রে করার মতন গুলি করতে করতে ফয়সল লোণ বাড়ি বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসতে লাগল, ঠিক সেই সময় ওপর দিক থেকে বেশ কয়েকটি গুলি ছুটে আসে ফয়সলের দিকে, যা ফয়সলের মাথা ঝাঁঝরা করে দেয়। কিন্তু গুলিটা ওপর দিক থেকে কে তাঁকে লক্ষ্য করে করল তা কেউ বুঝতে পারেনি।

আর সকালের অপেক্ষা কেউ করেনি, ফয়সলের ক্ষতবিক্ষত দেহটা সেনা রাতারাতি গ্রাম থেকে সরিয়ে দেয়। আর আবদুল লোণকে মাদক চালান আর জম্মু বাস ডিপো বিস্ফোরণের মূল চক্রী হিসেবে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বাড়ি থেকে বহু বিস্ফোরক এবং মাদক সেনা এবং কাশ্মীর পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে।

সেদিন ভোরে মহাপারার দরজায় টোকা পড়ে। মহাপারা ভাবে সুনীল ভোরবেলায় তাঁর কাছে নাস্তা করতে এসেছে। সে খুশি মনে চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুঁজে কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর চিৎকার করে ওঠে “আব্বু”।

মহাপারার চিৎকারে তাঁর ভাইবোনেরা ঘুম থেকে উঠে পড়ে।

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *