বিরসা মুন্ডা উবাচ

দেবশ্রী চক্রবর্তী

সুগানা মুন্ডার ছেলে বিরসা মুন্ডা অরণ্যের অধিকার চেয়েছিল। সে চেয়েছিল কৃষ্ণ ভারতের অধিকার ফিরিয়ে দিতে ভারতবর্ষের আদিম অধিবাসীদের হাতে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিরসা মুন্ডার নাম ও তার অবদান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এমন এক আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে তার অভ্যুত্থান হয়েছিল তা শুধুমাত্র বিদেশী সরকারের বিরুদ্ধে নয়, তা ছিল সমগ্র দিকু সমাজের বিরুদ্ধে। মুন্ডাদের ভাষায় দিকু অর্থ মহাজন, জমিদার, রাজপুত, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার সম্প্রদায়। যাদের শোষণের বিরুদ্ধে উত্থান হয়েছিল কৃষ্ণ ভারতের ভগবান “ধরিত্রী আবার”। যার আগমনে মুন্ডাদের কয়েশ বছরের প্রতীক্ষার অবসান হয়েছিল। এ বিদ্রোহ সমকালীন ফিউডান ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও।

১৯৯০ সালে তখন আমি খুব ছোট একবার পালামৌতে বেড়াতে গেছিলাম। তখন বোঝার মতন বয়স আমার ছিল না, নিতান্ত ছেলেমানুষ আমি নিজের মতন গভীর জঙ্গলের আদিমতায় যেন ডুব দিয়েছিলাম। সন্ধ্যার দিকে বাবা মায়ের সাথে জঙ্গলের পথে একটি জলপ্রপাত দেখে ফিরছিলাম। জলপ্রপাতটি দেখতে পাহাড় থেকে অনেকটা নিচের দিকে নেমে যেতে হয়েছিল। মেঠো ভঙ্গুর পথ আর জঙ্গলি গাছপালা সরিয়ে আমরা জলপ্রপাত দেখে যখন ওপরের দিকে উঠে আসছি প্রায় অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে দূর থেকে মাদলের আওয়াজ আর আদিম এক সুর ভেসে আসছে। আমরা চলতে চলতে থেমে গেলাম। দেখি এক বৃদ্ধের গলায় মালা, পরনে সাদা ধুতি খাটো করে পরা, তিনি মাদল বাজিয়ে আসছেন, পেছন একদল আদিম নর নারী , তারা আদিম সুরে গান গাইতে গাইয়ে চলেছে।পালামৌ যাবার কিছু দিন আগে আমি মহাশ্বেতা দেবীর লেখা “অরণ্যের অধিকার” বইটি পড়েছিলাম। এই আদিম সুর আমার মনের ভেতর আবেগের তরঙ্গ তৈরি করল। নিজের অজান্তে গুঙিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম। মা আমাকে কাঁদতে দেখে প্রশ্ন করতেই বলেছিলাম বিরসার জন্য মন কেমন করছে। আমার কাছে বিরসার মৃত্যুটা তখন টাটকা স্মৃতি। ৯ ই জুন ১৯০০, রাঁচি জেলে সকাল আটটার সময় আমাদের ভাই বিরসা রক্ত বমি করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেছিল। অজ্ঞান বিরসার অচেতন মনে এগিয়ে চলেছিল ফেব্রুয়ারি মাসের এক রাতের দিকে। যে বিরসাদের ভাগ্যে ভাত তো জোটেনা, তারা তো ঘাটো খেয়েই থাকত। তাই বিরসা ঘোষণা করেছিল, ” মুন্ডা শুধা ঘাটো খাবে কেন? কেন সে দিকুদের মতো ভাত খাবে না?” আর ৩রা ফেব্রুয়ারি বিরসা ধরা পড়েছিল সেই ভাত খাবার জন্যই। বিরসা ঘুমচ্ছিল, মেয়েটা ভাত রাঁধছিল। জঙ্গলের মাঝে ধোঁয়া দেখেই ওরা বুঝে যায় এখানেই বিরসা আছে। ব্যাস ধরা পড়ার পর শুরু হয় অমানবিক অত্যাচার। মৃত্যুর কারণ হিসেবে কলেরা রোগ দেখানো হলেও কলেরায় তার মৃত্যু হয়নি, হয়েছিল অত্যাচারে। মুন্ডা কয়েদিরা গান গেয়ে, নিজেদের হাতে পায়ের শিকল নাড়িয়ে নিজেদের ভগবানের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিল।

দিকুরা মুন্ডা গ্রাম গুলো দখল করে নিয়ে গৃহ হারা করে দিয়েছিল তাদের। হাজার হাজার মুন্ডারা ভূমিদাসে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছিল। যারা ছিল অত্যন্ত সৎ এবং ভদ্র। পেটে ভাত না থাকলেও তারা কোন দিন প্রভুর জমি থেকে এক মুঠো শস্য চুরি করেনি। কিন্তু এই মানুষ গুলোর এই পরিণতি মেনে নিতে পারেনি বিরসার মা সুগানা। তিনি চেয়েছিলেন ছেলেকে জার্মান মিশন থেকে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা দিতে, ছেলে শিক্ষিত হলে সুগানা আদালতে মামলা করবে, তার ছেলে মুন্ডাদের নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরবে সরকারের কাছে। বিদেশি ভাষায় শিক্ষিত হয়ে বিরসা একটা ব্যাপার অনুভব করেছিল খ্রিস্টান মিশনারিই হোক কিংবা দিকুই হোক কেউ মুন্ডাদের ভালো চায়না। দিকুরা অত্যাচার করে মুন্ডাদের সর্বস্বান্ত করবে আর সেই সুযোগে মিশনারিরা তাদের ধর্মান্তরিত করবে। এতে কোন সমস্যার সমাধান হবে না। তাই বিরসা হাজার হাজার মুন্ডাদের একত্রিত করে তাদের মাঝে আদিম ভারতের ইতিহাসে তাদের পূর্বপুরুষদের কথা তুলে ধরে বিপ্লবের বীজ ছড়িয়ে দেন। ধীরে ধীরে সবাই তাকে নিজেদের দেবতা ” ধরিত্রী আবা” হিসাবে মেনে নেন। বিরসা অসাধারণ বাঁশী বাজাত। সে যখন বাঁশী বাজাত জংগলের পশুরাও মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে তার সেই ধ্বনী শুনত। তার এই চরিত্রের জন্য তাঁকে মুন্ডারা কৃষ্ণের অবতার ভাবতে থাকে।

বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে ১৮৯৯-১৯০০ সালে ‘মুন্ডা বিদ্রোহ’ সংগঠিত হয়। রাঁচির দক্ষিণাঞ্চলে সৃষ্ট এই বিদ্রোহকে মুন্ডারি ভাষায় বলা হয় ‘উলগুলান’। যার অর্থ ‘প্রবল বিক্ষোভ’। এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল মুন্ডা রাজ ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা।

ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭ সালে। আমরা সবাই জানি, এ স্বাধীনতা একদিনে আসেনি বা কোনো একক আন্দোলনের ফল হিসেবেও আসেনি। পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষা ও তার আনুষঙ্গিক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যেমন নানা স্থানে নানা ধারার স্বাধীনতা সংগ্রাম সূচিত হয়েছিল, তেমনি এ শিক্ষার বাইরে থেকেও জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামকে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপান্তর করেছিল অনেক বীর জনগোষ্ঠী। ছোট নাগপুর মালভূমি, ছত্তিসগড়ের বনভূমি, বিহারের বিভিন্ন জনপদ জুড়ে তেমনি এক বিদ্রোহের আগুন জ্বেলেছিল বিরসা মুণ্ডা আর তার বাহিনী।

ব্রিটিশ আমলে মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর প্রধান আবাস ছিল ছোট নাগপুর, মালভূমি, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, বিহারের কিছু অরণ্য অঞ্চল। মোগল আমলে খুত্কাট্টিদার বা প্রাথমিক বন পরিষ্কারকারী হিসেবে মুণ্ডারা কিছু ভূমি অধিকার ভোগ করত। কিন্তু উনিশ শতকজুড়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নানামুখী চাপে জমি হারাতে থাকে তারা। ১৮৮২ সালে ব্রিটিশ সরকার ফরেস্ট অ্যাক্ট ঠওও পাস করে, যার আওতায় তারা বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল গড়ে তোলে। আর এতে মুণ্ডা, ওঁরাও, খারিয়া প্রভৃতি আদিবাসীর জীবনধারা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে। প্রথম থেকেই সরকারের উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসী কৃষি ব্যবস্থাকে সামন্তবাদী কৃষিতে রূপান্তর করা এবং এর মাধ্যমে উদ্বৃত্ত আহরণের একটা সহজ পথ খুলে দেয়া। কিন্তু অতি নিম্নপর্যায়ের কারিগরি সামর্থ্য নিয়ে আদিবাসীদের পক্ষে অভীষ্ট উদ্বৃত্ত সৃষ্টি সম্ভব ছিল না। স্থানীয়দের সক্ষমতা বৃদ্ধির কষ্টকর পথে না হেঁটে ব্রিটিশ সরকার ও তাদের দেশীয় সামন্তরা হাঁটল অন্য পথে। তারা বাইরে থেকে নিয়ে এল বাঙালি, বিহারি, উড়িয়া চাষীদের। সেখানে গড়ে উঠল দিকু নামে পরিচিত বহিরাগত জমিদার, জায়গিরদার, ঠিকাদার শ্রেণীর একাধিপত্য এবং অত্যাচার। ভূমিপুত্ররা হলো ভূমিহারা।

এ সময় মঞ্চে প্রবেশ করে খ্রিস্টান মিশনারির দল। তারা মুণ্ডাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার সুযোগে তাদের দলে দলে খ্রিস্টান বানাতে শুরু করে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ মুণ্ডা খ্রিস্টান মিশনারিতে নাম লেখায়। সঙ্গে তারা নিয়ে আসে শিক্ষা। মিশনারিদের সহযোগিতায় শিক্ষিত মুণ্ডারা দিকু অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। মূলত মুণ্ডা উপজাতীয় সরদারদের এ আন্দোলন সরদারি আন্দোলন নামে পরিচিত। কিন্তু অখ্রিস্টান প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মুণ্ডা এ আন্দোলনের বাইরে থাকে, ফলে সরদারি আন্দোলন মুণ্ডাদের ভাগ্য পরিবর্তনে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারল না। আসলে সময় অপেক্ষা করছিল এক কালপুরুষের আবির্ভাবের জন্য, যার নাম বিরসা মুণ্ডা।মিশনারি স্কুলে থাকতে বিরসা সরদারি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। প্রথম দিকে সরদারদের আন্দোলনে মিশনারিদের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি থাকলেও প্রশাসনের সঙ্গে সরদারদের দ্বন্দ্ব্ব বেড়ে যাওয়ার কারণে তারা ক্রমে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাছাড়া অখ্রিস্টান মুণ্ডাদের বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণের বিষয়টিও মেনে নিতে পারেনি মিশনারিরা। তারা বিরসাকে সরদারদের সঙ্গ ছাড়ার জন্য চাপ দেয়। জবাবে ১৮৯০ সালে বিরসা ছাড়লেন মিশনারি আর খ্রিস্ট ধর্ম, পরিবারের সবাইকে নিয়ে। এদিকে অভিজ্ঞতার আলোকে সরদারি আন্দোলনের প্রতিও তার মোহমুক্তি ঘটে। তিনি দেখতে পেলেন মুণ্ডা তথা আদিবাসীদের দুরবস্থার জন্য একা দিকুরাই দায়ী নয়, এখানে রয়ে গেছে দিকু, প্রশাসন তথা সরকার ও মিশনারির ত্রহস্পর্শ। একদিকে বন আর ভূমির অধিকার কেড়ে নিয়েছে বিজাতীয় সরকার আর তাদের দেশীয় দোসর দিকুরা, অন্যদিকে মিশনারির বিজাতীয় ধর্ম তাদের করে দিচ্ছে আত্মিকভাবে নিঃস্ব। বনভূমির হাজার বছরের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা হয়ে পড়েছে নিজ বাসভূমে পরবাসী। বিরসা রুখে দাঁড়ালেন।

মাত্র ২০ বছর বয়সে, ১৮৯৫ সালে তিনি ঘোষণা দিলেন নতুন ধর্মের; যার মূল ভিত্তি হলো আদি একেশ্বরবাদী মুণ্ডা ধর্ম। নিজেকে ঘোষণা করলেন ভগবানের অবতার হিসেবে। মেনে নিল মুণ্ডারা। এ রকম একজন ত্রাণকর্তারই তো অপেক্ষায় ছিল তারা। দলে দলে মুণ্ডা, ওঁরাও, খরাই নরনারী নতুন ধর্ম গ্রহণ করে পরিচিত হলো বিরসাইত নামে। সম্ভব অসম্ভব বিভিন্ন কাহিনী ছড়িয়ে পড়ল তার নামে। তার পরিচয় হলো ‘ধরতি আবা বা জগৎ পিতা’ নামে। তার জন্য জীবন দিতে এগিয়ে এল হাজার হাজার নরনারী। তারা গান বানাল বিরসার নামে— ‘মুণ্ডারাজ ফিরাবে তাই নতুন রাজার জন্ম হে।’ এ সময়টির জন্যই তো অপেক্ষা করছিলেন বিরসা আবা, পিতা বিরসা।

আঘাতের মাহেন্দ্রক্ষণটি সরকারই তুলে দিল বিরসার হাতে। ১৮৯৪ সালে সরকার ৮২ সালের ফরেস্ট আইন ছোট নাগপুরের সংরক্ষিত বনে প্রয়োগ করার উদ্যোগ নিল, সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠল পাহাড়ের জঙ্গলের যত বিরসাত বাহিনী। উপায়ান্তর না দেখে ১৯৯৫ সালে জেলা পুলিশ বিরসাকে বন্দি করল, উসকানি আর বিদ্রোহের অভিযোগে তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়ে দিল। কিন্তু কারাভ্যন্তরে বিরসা যেন আরো শানিত হলেন। তার সম্পর্কে নিত্যনতুন মিথ ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র, যার মূল কথা একটাই— ধরতি আবা পিতৃপুরুষ সব রাজাদের হয়ে বিজয় ছিনিয়ে নিতে শিগগিরই সাদা ঘর (জেল খানা) থেকে বের হয়ে আসছেন। তাদের ভাষায়: ‘সিরমারে ফিরুন রাজা যাই অর্থাৎ পিতৃপুরুষ রাজার জয়।’ অতঃপর বিরসা জেল থেকে মুক্তি পেলেন ১৮৯৮ সালে, মুণ্ডাদের বিশ্বাসে যা ছিল— মহাপুনরুত্থান। মুক্তি পেয়েই বিরসা ডাক দিলেন ‘উলগুলান’ বা স্বাধীনতা যুদ্ধের। তাঁর উলগুলান ডাকে সরদাররা পড়ে গেল দোটানায়। একদিকে আপামর মুণ্ডা জনতা বিরসার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ, তাদের বিপক্ষে যাওয়ার মতো শক্তি তাদের ছিল না, অন্যদিকে তাঁর স্বাধীনতার ডাক ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ— এ সাহসও তাদের ছিল না। কিন্তু বিরসা তার লক্ষ্যে ছিলেন স্থির। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মুণ্ডাদের আসল সংগ্রাম রাজনৈতিক। স্বাধীন মুণ্ডারাজ ব্যতীত তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির আর কোনো পথ নেই। তার উলগুলানের লক্ষ তাই— ‘আবুয়া দিসুন বা স্বরাজ’। খুন্তি, তমর, বাসিয়া, রাঁচিসহ মুণ্ডা অঞ্চলের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল বিদ্রোহ। বিরসা তাঁর প্রধান কেন্দ্র করলেন ডোম্বরি পাহাড়, আর কৌশল হিসেবে বেছে নিলেন গেরিলা পদ্ধতি। ১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর বিরসার ঝটিকা আক্রমণে বিধ্বস্ত হলো রাঁচি ও খুন্তি শহর। ‘হেন্দে রানব্রা কেচে কেচে- পুণ্ডি রানব্রা কেচে কেচে’ (কালো খ্রিস্টানদের কেটে ফেলো- সাদা খ্রিস্টানদের কেটে ফেলো) ধ্বনিতে রাঁচি খুন্তির আকাশ ছেয়ে গেল। বেশকিছু পুলিশসহ নিহত হলো অনেক মানুষ, অগ্নিদগ্ধ হলো শতাধিক ভবন; বিরসা আবার ফিরে এলেন আস্তানায়। গেরিলা যুদ্ধের জবাবে ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করল পোড়ামাটি নীতি। ১৫০ সেনা নিয়ে কমিশনার ফোর্বস ও ডেপুটি কমিশনার স্ট্রিটফিল্ড নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করলেন চার শতাধিক মানুষ, কেউ সশস্ত্র কেউ নিরস্ত্র। ডোম্বরু পাহাড়ের নাম হলো ‘তপেড় বুরু বা লাশের পাহাড়’। কিন্তু বিরসাকে ধরতে পারলেন না। তিনি হারিয়ে গেলেন গহিন অরণ্যের গভীরে। অতঃপর তারা গেলেন ব্রিটিশের চিরপরিচিত ‘কূট’ পথে। ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করলেন বিরসাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য।

অবশেষে বিরসা বন্দি হলেন ১৯০০ সালের ৩ মার্চ, চক্রধরপুরের যমকোপাই বনে, নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত অবস্থায়। সে ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। বিরসার পরম অনুগত পরমী মুণ্ডা ভাত রাঁধার ছল করে আগুন জ্বেলেছিল বনে, তার ধোঁয়ার সংকেত ধরে শশিভূষণ রাই আর ছয় মুণ্ডা গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় ধরে ফেলে বিরসা ভগবানকে। ৫০০ টাকা, পত্তনী জমি আর পেট ভরে খাওয়ার লোভ থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারল না এত সংগ্রাম, ত্যাগ আর তিতিক্ষায় পোড় খাওয়া ভগবানের কাছের মানুষরা।

উলগুলানের কার্যত এখানেই সমাপ্তি, কিন্তু নাটকের যবনিকা আরো পরে। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে বিরসার মৃত্যু পর্যন্ত। তবে তা ঘটবে অচিরেই। বিরসা একবার জেল থেকে বের হয়ে শতগুণ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠেছিল, তাই আরেকবার তাকে জেলের বাইরে দেখতে চাইছিল না রাঁচির প্রশাসন। এদিকে বিরসা আর মুণ্ডা বিদ্রোহ নিয়ে বেঙ্গলি আর স্টেটসম্যান পত্রিকায় বিব্রতকর সব লেখালেখি। এ অবস্থা থেকে যেন মুক্তি দিতেই খবরটা এল— ৮ জুন রাতে বিরসার তিনবার দাস্ত হয়েছে, সকালে রক্ত বমি করে তিনি অজ্ঞান। হাসপাতালে নেয়ার বদলে সুপার বসে রইল কখন বিরসার মৃত্যু হবে। সকাল ১০টার দিকে বিরসা চলে গেলেন। মুণ্ডাদের কবর দেয়া হয়, কিন্তু বিরসাকে তড়িঘড়ি করে দাহ করা হলো। উদ্দেশ্য ছিল দুটো: তাঁর মৃত্যুর আসল কারণ ধামাচাপা দেয়া, আর মুণ্ডাদের বোঝানো বিরসা ভগবান নয়, সামান্য আসামি, নশ্বর মানুষ। তড়িঘড়ি একটা পোস্টমর্টেম রিপোর্টও তৈরি করলেন রাঁচির জেল সুপার ক্যাপ্টেন এআরএস এন্ডারসন, যাতে লেখা হলো— আমাশয় ও কলেরায় মৃত্যু হয়েছে বিরসা মুণ্ডার। মৃত্যুর আসল কারণ কী ছিল, তা আর প্রমাণ করা যায়নি ঠিক, তবে সবাই যে সত্যটি জানে তা হলো— বিরসাকে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বিরসা মুণ্ডা ছিলেন ভারতের স্বাধীনতার ভোরের পাখি। এ রকম ভোরের পাখিদের কলকাকলীই তো বয়ে এনেছিল স্বাধীনতার সোনালি সকাল।

লেখা শুরু করেছিলাম একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে, শেষ করবও নিজের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। ২০০৫ সালে মানবাজারে স্বামীর পোস্টিং হয়। সেখানে গিয়ে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পরি। ডাক্তার লায়েক নানারকম পরীক্ষা করে জানান আমি গর্ভবতী। আমার সন্তান গর্ভে এসেছিল মানবাজারে, যা একসময় মানভূম ছিল। সেই সময় ঠিক করি যদি ছেলের জন্ম হয় নাম রাখবো বিরসা। যাই হোক, ছেলে হয়নি, মেয়ের জন্ম হয়েছিল, কিন্তু এখনো ওকে আদর করি বিরসা বলে ডেকেই, কারন ওর আগমন সেই বীরের ভূমি থেকে।

আধুনিকতার দিকে এগোতে গিয়ে চারিদিকে চলছে ব্যাপক হারে অরন্য নিধন। এক সময় মহারাষ্ট্রের অমরাবতী অঞ্চলে ছিল বিশাল সেগুনের বন। সেখানে “কোরকু” অধিবাসিদের বসবাস। নাসিক থেকে হাওড়া রেলপথ বসাতে গিয়ে এই বন ধ্বংশ করা হয়। যার ফলে এই উপজাতীও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ১৯৮০ সাল নাগাদ পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ায় ব্যাপক জঙ্গল নিধন শুরু হয়। যে জঙ্গল বিরসার কাছে ছিল ধরিত্রী, পালয়িত্রী, রক্ষয়িত্রী তাঁকে হাতে ধরে শেষ করছে আধুনিক সভ্যতার একদল দানব। যশোর রোডের গাছেদের মৃত্যুদন্ড কিছু দিনের জন্য আটকানো গেছে। কিন্তু কতদিন আটকানো যাবে আমার যানা নেই। চারিদিক থেকে অরন্যের কান্না ভেসে আসছে। সমগ্র অরন্য সমাজকে সামন্ততান্ত্রীক, ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বর্তমান সমাজে বিরসার মতন এক বীর সন্তানের প্রয়োজন।

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *