বর্তমান সময়টা আয়নায় ভেসে উঠলো

By Ramiz Ali Ahmed   ছবি:গোত্র                                                          পরিচালনা:নন্দিতা রায়,শিবপ্রসাদ                         মুখোপাধ্যায়                                                          অভিনয়:অনসূয়া মজুমদার,নাইজেল                  আকারা,খরাজ মুখোপাধ্যায়,মানালি মনীষা        দে,বাদশা মৈত্র,অম্বরীশ ভট্টাচার্য,সাহেব               ভট্টাচার্য                                                                                                                                                                       রেটিং:৪/৫

উনিশ শতকে বাংলায় এক নবযুগের সূচনা হয়।মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা,অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার প্রভৃতির বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবতাবাদী আদর্শের প্রসার ঘটেছিল।রাজা রামমোহন রায়,ডিরোজিও,দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর,কেশবচন্দ্র সেন,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দর মতো মনীষারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলার ভাবধারার সংস্কার ঘটেয়েছিলেন।আমরা উনিশ শতক ছেড়ে বিশ শতক পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে পদার্পন করেছি।প্রত্যেকের হাতে অ্যানড্রয়েড ফোন,গুগুল নামক বিশেষ একটি সার্চ ইঞ্জিনের দৌলতে সবাইয়ের সবকিছুই জানা।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার আমরা কিরকম যেন মধ্যযুগে চলে যাচ্ছি,সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা মাথা চাড়া দিচ্ছে,ধর্ম নিয়ে হানাহানি,ধর্মীয় বিভেদ রেখা বিশালভাবে স্পষ্ট হচ্ছে।মানুষ নয় এখানে মানুষের ধর্মটাই বড় হয়ে উঠছে।সে কিরকম মানুষ, তার মনুষ্যত্ব কি সেটা বড় নয়,সে কি ধর্মের সেটাই বড় হয়ে উঠছে!রাজনীতি নামক এক বিষ আমাদের সেই ধর্মের আফিম খাওয়াচ্ছে আর আমরা সব কিছু ভুলে সেই নেশাতেই আছি।চলছে এক অস্থির সময়।কে কি করবে,কে কি খাবে সেটা ঠিক কেউ ঠিক করে দেবে,আর সেটাই মেনে চলতেও হবে।সমাজে যখন এরকম কোনও পরিস্থিতি হয়, দরকার পড়ে সমাজসংস্কারকদের।তারা তাদের আগুনঝরা বক্তব্য,লেখনি,নাটক,সিনেমা দিয়ে তাদের প্রতিবাদ জানায়,সমাজ সংস্কারের পথ দেখায়।
কিন্ত সেরকম আগুন ঝরানো লেখা,কবিতা না পাওয়া গেলেও পরিচালক নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘গোত্র’ ছবিতে বর্তমান সময়ের প্রতিফলন পাওয়া গেল আয়নার মতো।শুধু তাই নয় সুন্দরভাবে সম্প্রিতীর বার্তাও দিলেন।পরিচালকদ্বয়কে স্যালুট জানাই এরকম একটা সমাজসংস্করক ছবি উপহার দেওয়ার জন্য।এরকম একটা ছবি এরকম সময়ে দাঁড়িয়ে খুবই দরকার ছিল।আমরা একই বৃন্তে দুটিই কুসুম হিন্দু-মুসলমান, দুজনেরই রক্তের রং লাল,তাহলে কেন এতো হানাহানি!কেন এতো বিভেদ!মুসলিমদের ঈদের চাঁদ আর হিন্দুদের পূর্ণিমার চাঁদ তো একই। ছবিতে মুক্তিদেবী(অনসূয়া মজুমদার) ‘গোবিন্দধাম’ নামে একটা বড় বাড়িতে একা থাকেন।ছেলে অনির্বান(সাহেব চট্টোপাধ্যায়)চাকুরীসূত্রে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বিদেশে থাকে।মুক্তিদেবী ভীষণ খিটখিটে ,শুচিবাইগ্রস্ত মহিলা কোনও কেয়ারটেকার বেশিদিন থাকে না।পাড়ায় ‘হিটলার মাসিমা’ নামেই পরিচিত। মাসিমার সমস্তু মাসকাবারী জিনিসপত্র দিয়ে যায় ঝুমা(মানালী মনীষা দে)।এবং অবসর সময়ের সঙ্গীও বটে। অনির্বাণ ও তার পুলিশ কর্তা বন্ধু ঋতম(বাদশা মৈত্র) মিলে মুক্তিদেবীর বাড়িতে কেয়ারটেকার হিসাবে ঠিক করে দেয় নয়বছর জেলে থাকা আসামী তারিক আলিকে(নাইজেল আকারা)।মুক্তি দেবীর ভয়ে ছেলে অনির্বাণ তারিকের আসল পরিচয় গোপন করে পরিচয় দেয় তারক গুহ বলে।এদিকে ‘গোবিন্দধাম’-এর দিকে লোলুপ দৃষ্টি পাড়ার শকুন বাপির(খরাজ মুখোপাধ্যায়)।প্রথমে পছন্দ না করলেও তারিককে বেশ ছেলের মতো ভালোবেসে ফেলে মুক্তিদেবী।ঝুমাও প্রেমে পড়ে তারিকের।তারপর কি হয় তা নিয়েই কাহিনি।পরিচালক যেভাবে মানুষের গোত্র হিসেবে মনুষ্যত্ব আর ধর্ম হিসেবে মানবধর্মকে উপস্থাপন করলেন তা আরেকবার প্রশংসা করতেই হয়।শিবপ্রসাদের চিত্রনাট্যে নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় প্রত্যেকে তাঁদের চরিত্র অনুযায়ী যথাযথ অভিনয় করেছেন। চিত্রনাট্যে প্রতি পদে পদে রয়েছে সুন্দর ডায়লগ।অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ছবির গান গুলো বেশ মানানসই।সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাঙ্গাবতী’ গান তো ছবি মুক্তির বহু আগেই হিট।ওম-দেবলীনার একটা গানের উপস্থিতিতেই হাততালি পড়ে।‘মাসিমা হিটলার’ গানে বিশ্বনাথ বসু দুর্দান্ত,এই প্রথম তিনি ছবির জন্য গানও করলেন।ভালো লাগে ছবির সিনেমাটোগ্রাফি ও সম্পাদনা।কে বলে বাংলা ছবি দেখছে না!ভালো ছবি হলে নিশ্চয়ই দেখবে।আর এ ছবি তো সুপারহিট হবেই।সাথে বাংলা ছবির জগতে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *