ঠিক যেন রূপকথা

সৌরভ গাঙ্গুলি পড়েছেন মহাবিপদে । উইকেটের পিছনে কাকে দাঁড় করাবেন ! এমনিতেই নড়বড়ে দলকে নিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করে চলেছেন তিনি । ম্যাচ ফিক্সিং কাণ্ডের পরে গোটা ভারতীয় ক্রিকেট দল মানষিক ভাবে বিপর্যস্ত । ক্যাপ্টেন হিসেবে শুধু দলের পারফরম্যান্স ই নয় , অভিভাবক হিসেবে দলের মানসিকতা পরিবর্তনের দায়িত্বও যে তার কাঁধে । শুরু হল একের পর এক এক্সপেরিমেন্ট । মাত্র পাঁচটি বছর ..1999 থেকে 2004 সাল … এর মধ্যে জাতীয় দলে খেলে ফেললেন প্রায় 8 জন উইকেটকিপার । এম এস কে প্রসাদ , সাবা করিম , বিজয় দাহিয়া , সমীর দিঘে , দীপ দাশগুপ্ত , অজয় রাতরা , পার্থিব প্যাটেল , দীনেশ কার্তিক , সাথে রাহুল দ্রাবিড়ও । কখনও টেস্টে একজন তো ওয়ানডেতে অন্যজন , বাংলাদেশে একজন তো অস্ট্রেলিয়ায় অন্যজন… এভাবেই চলছিল.. কিন্ত সৌরভ ও যে নাছোড়বান্দা .. এর শেষ দেখেই ছাড়বেন …

2003 সাল …একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক হাওড়া থেকে ট্রেনে করে জামশেদপুর যাচ্ছেন , অনুর্ধ 19 বিহার দলের খেলা দেখতে । ইচ্ছে বিশেষ নেই মাঠে যাবার , কিন্ত তিনি আবার বিসিসিআই দ্বারা নিযুক্ত ট্যালেন্ট রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অফিসার , তাই কিছুটা জোর করেই মনের বিরুদ্ধে ট্রেনে চাপলেন । ঠিক করলেন , আজ মাঠে গিয়ে একটা জম্পেশ ঘুম দেবেন , আর এসব খেলা দেখে হবেই বা কি ! খেলা শেষে আম্পায়ার দের কাছে থেকে প্লেয়ার দের পারফরম্যান্স জেনে নিলেই হবে । এখান থেকে কি আর শচীন , সৌরভ বেড়োবে !! এত খুঁটিয়ে খেলা দেখে কোনো লাভই নেই ।

না …..উপরওয়ালার কৃপায় সেদিন আর ঘুম আসেনি তার । আর খেলা শেষে রেকমেন্ডেশন কলামে শুধু একজন কে নিয়েই এই নোটটি লিখেছিলেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমি কে , “Good striker of the ball; has a lot of power but needs to work on his wicket keeping. Technically not very good. Is very good at running between wickets.”

2004 সাল , কেনিয়া সফরে যাচ্ছে ভারতীয় এ দল । প্রায় গোটা টিম সিলেকশন মিটিং নির্বিঘ্নে পার করে এসেও, উইকেটকিপার সিলেকশনে এসে লাগল বিপত্তি… দীপ দাশগুপ্ত না তিনি …. দুজনেই যে ইস্ট জোনের প্লেয়ার । অনেক বাকবিতণ্ডা র পর মুখ্য নির্বাচক কিরণ মোরে চান্স দিলেন তাঁকে….

ঐ বছরই , পূর্বাঞ্চলের নির্বাচক প্রণব রায় বাংলাদেশ সফরের জন্য প্রস্তাব করলেন তাঁর নাম , গাঙ্গুলিকেও বোঝালেন । ফলস্বরূপ দেশের জাতীয় দলের হয়ে জীবনের প্রথম ওয়ানডেতে অভিষেক হল তার, চট্টগ্রামের মাঠে … কিন্তু প্রথম বলেই যে শূন্যতে রান আউট …পরের ম্যাচে মাত্র 12 , তার পরের ম্যাচে অপরাজিত 7 …. দেশে ফিরে এসে পাকিস্তানের বিপক্ষে পরের ম্যাচে 3 …. সবাই ধরেই নিয়েছিল কেরিয়ার শেষ ….. তিনি নিজেও ভেবেছিলেন আর হয়ত হলনা … কিন্তু তাকে বাদ দিবে কে !!! দলের অধিনায়ক ই তো তার পক্ষে …সৌরভের প্রখর ক্রিকেট মস্তিস্ক বুঝল , তাকে আরো উপরে খেলাতে হবে .. যেমন ভাবা তেমনি কাজ .. ভাইজাগে তার পরের ম্যাচেই নিজে চারে নেমে গিয়ে তাকে তুলে আনলেন তিনে …. ফল ? 4টি ছয় আর 15 টি চার মেরে 123 বলে 148 রান .. ভারত সহ গোটা ক্রিকেট বিশ্ব বুঝল তার ক্ষমতা … সেই শুরু

2007 ক্রিকেট বিশ্বকাপে শোচনীয়ভাবে হেরে বাড়ি ফিরেছে ভারত । সৌরভ , শচীন , দ্রাবিড় ঘোষণা করলেন যে দক্ষিণ আফ্রিকায় আসন্ন T20 বিশ্বকাপে তাঁরা খেলবেন না , পরিবর্তে নতুন দের সুযোগ দেওয়া হোক । এমন সিদ্ধান্তে নির্বাচকরা পড়লেন বিপদে , একে তো তখনও পর্যন্ত ভারতীয় খেলোয়াড় রা সেভাবে T20 ক্রিকেট খেলেই নি আর তার উপর যদি দলের মাথাগুলো না থাকে , তাহলে কার উপর ভরসা করে দলকে পাঠাবো ! অগত্যা আবার এক্সপেরিমেন্ট … কিছু হবেনা জেনেই তাঁকে করা হল ক্যাপ্টেন , ভাবটা অনেকটা এরকম , আমরা কাপ জয় করতে নয় , খেলার ফরম্যাট টা বোঝার জন্য দল পাঠিয়েছি । এরপর কি হয়েছিল জানেন ??? তাঁর হাত ধরেই পাকিস্তানের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে প্রথমবারেই T20 ক্রিকেটে বিশ্বজয় …

আপামর ক্রিকেট বিশ্ব অবাক হয়েছিল , অবাক হয়েছিলাম আমরাও … কিন্তু কে জানত সেটা ছিল অবাক হওয়ার শুরু..

এরপর 2011 তে বিশ্বকাপ জয় , 2013 তে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি , 2009 এ টেস্ট ক্রিকেটের রাঙ্কিংএ এক নম্বর হয়ে ওঠা কিংবা টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করা … বলে শেষ করা যাবে না ।

আর তার নিজের রেকর্ড ! সেটাও বলে শেষ করা যাবে না ….
চতুর্থ ভারতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে 10000 রানের গন্ডি পার করা তাও আবার ছয় নম্বরে নেমে , 194 টা স্টাম্পিং করে বিশ্বরেকর্ড , এখনও পর্যন্ত ওয়ানডেতে 78 বার নট আউট , সাত নম্বরে নেমে সবথেকে বেশি সেঞ্চুরি … কি নেই তাতে ।

আজ হয়ত সূর্য্য আর মধ্যগগনে নেই , গোধূলিও আসন্ন , কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট আজ তাঁর হাত ধরেই মধ্যগগনে বিরাজ করছে । দেশে ক্রিকেটের এক আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছেন তিনি । যে ভারতীয় দল বিদেশে খেলতে গিয়ে প্রায় সব ম্যাচ হেরে মাত্র 1টি বা 2টি ম্যাচ ফ্লুকে জিতে আসত, তারাই কিনা বলে বলে বিদেশের মাটিতে সিরিজের পর সিরিজ জিতে চলেছে । আজ আমাদের ফিল্ডিংয়ের গতি এবং ক্ষীপ্রতা বিদেশিদের কাছেও ঈর্ষার কারন , রানিং বিট্যুইন দ্যা উইকেটেও আগের থেকে অনেক বেশি উন্নত আজ আমরা । হ্যাঁ , আজ প্রত্যেকটি ক্রিকেটার ই যেন মেশিন , চূড়ান্ত প্রফেশনাল তারা , রক্ত মাংসের মধ্যে ঢাকা থেকেও মেশিনগুলো শুধুমাত্র কম্যান্ডের অপেক্ষায় ।

2019 বিশ্বকাপের আর মাত্র 2 টো ম্যাচ বাকি ভারতের । বিশ্বকাপ শেষের পরই শোনা যাচ্ছে তার অবসর নিয়ে অনেক আশঙ্কার কথাও । তাকে যে প্রেডিক্ট করা খুব মুশকিল ! না হলে কেউ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলতে খেলতেই রাত 1 টার সময় রায়না কে বলতে পারেন, সাদা জার্সিতে ছবি তুলে রাখার জন্য । রায়না অবাক হয়ে কারন জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন , এই জার্সিতে আমাকে আর দেখতে পাবিনা । ঠিক পরের দিনই টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা ! কিরকম স্বার্থপর মানুষ ভাবুন , 2015 তে নিজের মেয়ে হয়েছে শুনেও দলের সঙ্গে বিশ্বকাপে থেকে যাওয়া !! বিশ্বকাপ শেষ করে আসার পরেই কিনা মেয়ের মুখ দেখা !! দেশের জন্য সব ত্যাগ করেছেন , কি দরকার ছিল ওই বলিদান ব্যাজ পরে কিপিং করতে যাওয়া কিংবা ছুটি পেলেই আর্মি ক্যাম্পে ছুটে যাওয়া ?? অনেকেই তো বলল এসব লোক দেখানো ;এক্সট্রা ফুটেজ নেওয়ার চেষ্টা কিন্ত তারা কি আপনার বেঁকে যাওয়া আঙ্গুল গুলো দেখেছে ? কিংবা বুড়ো আঙুল ফেটে গিয়ে নির্গত হওয়া রক্তপ্রবাহ টা ?

আজ তিনজন বাঙালির চোখে জল , যাঁরা কিছুটা হলেও আপনাকে এই পজিশনে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে । হয়ত তাঁরা সেভাবে প্রতিদান পাননি , কিন্তু সব আবিষ্কারের মধ্যে তার প্রতিদান ভাবলে গেলে চলে ! তাই এত লাইমলাইটের ছটায় একটু হলেও ধন্যবাদ প্রাপ্য সেই ট্যালেন্ট রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অফিসার প্রকাশ পোদ্দার , পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন নির্বাচক প্রণব রায় এবং সর্বোপরি তৎকালীন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির ।

পরিশেষে একটা কথায় বলব , আপনি হয়ত বোহেমিয়ান লাইফস্টাইলে বিশ্বাসী, ক্রিকেট ছেড়ে দিয়ে হয়ত বাইক নিয়েই বেরিয়ে পড়বেন দূর দুরান্তে , ঝড় তুলবেন বুদ্ধ সার্কিটে , কিংবা সিয়াচেনে সেনা ক্যাম্পে সময় কাটাবেন , সেভাবে হয়ত ঘুরেও তাকাবেন না এই ক্রিকেটের দিকে । হ্যাঁ আমরা জানি আপনি সব পারেন ….

তবুও যা দিয়ে গেলেন বা আরো যেটুকু দিয়ে যাবেন এই ভারতীয় ক্রিকেট কে , এই আপামর দেশবাসীকে , গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে তাতে একটাই কথা বলার আছে..

আপনি দেখিয়ে দিলেন , ব্যাট আর গ্লাভস হাতে শুধু 22 গজেই জয়লাভ করা নয় , নিষ্পাপ মন আর সরল হাসি দিয়ে হৃদয়টাও জিতে নেওয়া যায় ।

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *